প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ১০:০৯ পিএম
জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই তার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। দুই হাত কার্যত অকার্যকর হওয়া সত্ত্বেও পা দিয়ে লিখে একের পর এক শিক্ষাজীবনের ধাপ পেরিয়ে স্নাতকোত্তর সমমানের শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন সিরাজগঞ্জের নীলা খাতুন। এখন তার একমাত্র প্রত্যাশা একটি সম্মানজনক চাকরি, আর সেই চাকরির মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়ে নতুন প্রজন্মকে আলোর পথ দেখানো।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চর বড়ধুল গ্রামের দিনমজুর উসমান গনি ও শাহিনুর বেগমের চার সন্তানের মধ্যে নীলা তৃতীয়। জন্ম থেকেই তার দুই হাত স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাকে ভাগ্য হিসেবে মেনে না নিয়ে তিনি পা দিয়েই লেখালেখি, পরীক্ষা এবং দৈনন্দিন সব কাজ শেখেন।
শৈশবে পরিবারের সহায়তায় বিদ্যালয়ে যাতায়াত শুরু হলেও ধীরে ধীরে নিজের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির জোরে সবকিছুই নিজে করতে সক্ষম হন। বর্তমানে তিনি পা দিয়েই লেখেন, ঘরের বিভিন্ন কাজ করেন, কাপড় পরিষ্কার করেন, পানি তোলেন, গবাদিপশুর দেখাশোনা করেন এবং ছোট শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে নিজের খরচের একটি অংশও বহন করেন।
শিক্ষাজীবনেও নীলা ধারাবাহিকভাবে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি স্নাতকোত্তর সমমানের শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তার এই অর্জন শুধু পরিবার নয়, পুরো এলাকার মানুষের জন্য গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে।
নীলা বলেন, মানুষের সফলতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার মনোবল। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো লক্ষ্যই অসম্ভব নয়। তিনি জানান, বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান পাননি। সুযোগ পেলে তিনি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানদান করতে চান।
নীলার মা-বাবা জানান, আর্থিক সংকটের মধ্যেও মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। অনেক সময় নীলা নিজেই শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে নিজের শিক্ষা ব্যয় বহন করেছেন। এখন তাদের একমাত্র আশা, মেয়ের যোগ্যতার মূল্যায়ন করে তাকে একটি চাকরির সুযোগ দেওয়া হবে।
নীলার সংগ্রামের কথা জানার পর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা তার বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তার জন্য উপযুক্ত চাকরির সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং সরকারি নিয়োগে আবেদন করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও প্রদান করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, নীলার জীবনসংগ্রাম শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি সমাজের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার মতো মেধাবী ও অদম্য একজন মানুষ যদি কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, তবে তিনি সমাজ ও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।



