রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

অ্যাপেন্ডিসাইট অপারেশনের পর কিশোরীর মৃত্যু, জীবননগরে অপচিকিৎসার অভিযোগ

মোঃ জাহিদুল ইসলাম কাজল 

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম

অ্যাপেন্ডিসাইট অপারেশনের পর কিশোরীর মৃত্যু, জীবননগরে অপচিকিৎসার অভিযোগ

ছবি: প্রতিনিধি

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে অ্যাপেন্ডিসাইটের অপারেশনের পর সোহাগী খাতুন (১৪) নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলা ও অপচিকিৎসার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। গত রোববার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। 

মৃত সোহাগী জীবননগর উপজেলার হাসাদাহ ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের মোমিনুর রহমান মন্ডলের মেয়ে। সে স্থানীয় বিসিকেএমপি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী ছিল।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ আগস্ট সোহাগীকে অসুস্থ অবস্থায় জীবননগরের মনোয়ারা সনো সেন্টার অ্যান্ড নার্সিং হোমে নেওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডা. রফিকুল ইসলাম অ্যাপেন্ডিসাইট হয়েছে জানিয়ে দ্রুত অপারেশনের করার কথা বলেন। পরদিন ডা. রফিকুল ইসলাম তার অপারেশন করেন। এদিকে, অপারেশনের পর ৩০ আগস্ট সোহাগীকে বাড়িতে নেওয়া হয়। তবে বাড়িতে ফেরার পর থেকেই তার প্রচণ্ড বমি, মাথাব্যথা ও জ্বর শুরু হয়। পরে ২ সেপ্টেম্বর তাকে আবার ওই ক্লিনিকে নেওয়া হয়।

সোহাগীর মা লাভলী খাতুনের অভিযোগ করে বলেন, ‘মনোয়ারা সনো সেন্টারে ভর্তি করার পরের দিন পরীক্ষা করে রফিকুল ডাক্তার আমার মেয়ের অ্যাপেন্ডিসাইট হয়েছে বলে জানান। পরে দ্রুত অপারেশন করার কথা বলে তিনিই অপারেশন করেন। অপারেশনের পর থেকেই মেয়ের অবস্থা খারাপ ছিল। তবে নিময় অনুযায়ী ৩ দিন পর তাকে বাড়ি নিয়ে যায়। এর মধ্যে মেয়ের অবস্থা খারাপ হলে ফের মনোয়ারা সনো সেন্টারে ভর্তি করি। 

তবে তখন ডা. রফিকুল ইসলাম প্রথমে আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন, তিনি চিকিৎসা দিতে চাননি। অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে বলেন। তবে কিছুসময় পরে আবার নিজেই আমাদের ডেকে মেয়েকে ভর্তি করতে বলে চিকিৎসা দেন। তবে আমার মেয়ের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। সর্বশেষ তিনি ওষুধের পাশাপাশি ঘুমের ইনজেকশন দেন। ওই ইনজেকশন দেওয়ার পর সোহাগীর আর জ্ঞান ফেরেনি।’

তিনি আরও বলেন, পরদিনও জ্ঞান না ফেরায় তাকে যশোরের কুইন্স হাসপাতালে নেওয়ার জন্য বলেন রফিকুল ডাক্তার। সেখানে নেওয়ার পর সোহাগীর খিচুনি শুরু হয় এবং অবস্থার আরও অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। 

পরিবারের সদস্যরা জানান, ঢাকায় নেওয়ার পর চিকিৎসকরা দ্রুত তাকে আইসিইউতে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। আইসিইউতে নেওয়ার প্রায় আধা ঘণ্টা পর তার মৃত্যু হয়। সোহাগীর খালা নাসিমা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, ‘মনোয়ারা নার্সিং হোমের ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্টাফদের আচরণ খুবই খারাপ। রোগীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার ও অবহেলা করা হয়। সোহাগীর সঙ্গেও আমাদের সামনে গালিগালাজ করা হয়েছে। আমরা মনে করি, সে অপচিকিৎসার শিকার হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে রিপোর্ট দেখে ডা. রফিকুল ইসলাম অ্যাপেন্ডিসাইটের কথা বলে অপারেশন করেছিলেন, ঢাকার চিকিৎসকরা সেই রিপোর্ট দেখে বলেছেন, অপারেশন করার মতো কিছু ছিল না।’

সোহাগীর বাবা মোমিনুর রহমান মন্ডল বলেন, ‘আমার মেয়ে অপচিকিৎসা ও ডাক্তার-নার্সদের অবহেলার কারণে মারা গেছে। আর যেন কোনো বাবার আদরের সন্তান এভাবে মারা না যায়।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি দাবি করেন, ডা. রফিকুল ইসলাম ঢাকায় থাকেন। সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার তিনি জীবননগরে এসে চেম্বার করেন এবং ওই সময়েই বিভিন্ন রোগীর অপারেশন করেন। এর আগেও তার ক্লিনিকে এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মনোয়ারা সনো সেন্টার অ্যান্ড নার্সিং হোমের মালিক ও চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে এর আগে তিনি ফোনে দাবি করেছিলেন, তিনিই সোহাগীর অপারেশন করেছেন। এরপর তার কী অবস্থা তিনি কিছুই জানেন না।

চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়াউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা এখনো কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত কমিটি গঠন করে ক্লিনিকে গিয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!