রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চায়ের দোকান থেকে রিকশা চালক, সেই কাউসার এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই’র শিক্ষার্থী

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম

চায়ের দোকান থেকে রিকশা চালক, সেই কাউসার এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই’র শিক্ষার্থী

ছবি: সংগৃহীত

জীবনের শুরুটা ছিল অভাব আর সংগ্রামে ভরা। পড়াশোনার বয়সে অন্যদের মতো স্বচ্ছন্দ জীবন কাটানোর সুযোগ হয়নি। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে কখনো চায়ের দোকানে কাজ করেছেন, কখনো কাঠমিস্ত্রির দোকানে শ্রমিকের দায়িত্ব পালন করেছেন। কখনো মাটি কেটেছেন, ধান কেটেছেন, রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। জীবিকার প্রয়োজনে একসময় হাতে তুলে নিয়েছেন রিকশার হ্যান্ডেলও। তবে কোনো কাজই তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

ময়মনসিংহের কাউসার আহমেদের জীবনসংগ্রামের গল্পটা এমনই। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ধরে রেখেছিলেন তিনি। দীর্ঘ পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের ফল হিসেবে শেষ পর্যন্ত নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

ছোটবেলা থেকেই পরিবারের আর্থিক সংকট ছিল নিত্যসঙ্গী। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে অল্প বয়সেই কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয় কাউসারকে। কখনো চায়ের দোকানে কাজ করে দিন কাটিয়েছেন, আবার কখনো কাঠমিস্ত্রির দোকানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। কৃষিকাজের মৌসুমে ধান কাটার পাশাপাশি মাটি কাটার কাজও করেছেন। কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে টিউশনিও করেছেন।

কাউসারের কাছে কাজের মধ্যে ছোট-বড় কোনো পার্থক্য ছিল না। প্রয়োজনের তাগিদে যে কাজ সামনে এসেছে, সেটিই করেছেন। কারণ তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যতে নিজের ও পরিবারের অবস্থার পরিবর্তন করা।

উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি শুরু হলে সংগ্রামের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ভর্তি প্রস্তুতির খরচ, থাকা-খাওয়া এবং পরিবারের প্রয়োজন—সবকিছু একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসে রিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

দিনের একাংশ রিকশা চালিয়ে উপার্জন করতেন কাউসার। বাকি সময় ব্যয় করতেন ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে। রিকশা চালিয়ে পাওয়া অর্থ দিয়ে নিজের পড়াশোনা ও কোচিংয়ের খরচ মেটানোর পাশাপাশি বাড়িতেও টাকা পাঠাতেন। কখনো রিকশা চালিয়ে ক্লান্ত শরীরে পড়তে বসেছেন, আবার কখনো পড়াশোনার সময় ঠিক রাখতে কাজের সময় কমিয়েছেন।

কাউসার বলেন, ‘ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসে রিকশা চালিয়েছি। পাশাপাশি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছি। রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করতাম, তা দিয়ে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি বাড়িতেও টাকা পাঠাতাম। কষ্ট হতো, কিন্তু পড়াশোনার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আমাকে এভাবেই এগোতে হয়েছে।’

জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। চায়ের দোকান, কাঠমিস্ত্রির দোকান, নির্মাণকাজ, মাটি কাটা, ধান কাটা, কৃষিকাজ, টিউশনি—কোনো কাজকেই তিনি ছোট করে দেখেননি। তাঁর কাছে প্রতিটি কাজই ছিল স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি ধাপ।

অবশেষে পরিশ্রমের ফলও আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান কাউসার। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও জীবনের কষ্ট শেষ হয়নি। পড়াশোনার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের পরই মাকে হারান কাউসার। সন্তানের সাফল্য দেখার যে স্বপ্ন মায়ের ছিল, তা পূর্ণতা পাওয়ার আগেই তিনি চলে যান। মায়ের মৃত্যু কাউসারের জীবনে তৈরি করেছে গভীর শূন্যতা।

এদিকে তাঁর বাবাও বর্তমানে কর্মক্ষম নন। ফলে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বের কথাও ভাবতে হয় তাঁকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করে ভালো অবস্থানে পৌঁছে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

কাউসারের ভাষায়, ‘মাকে হারানোর কষ্ট সবচেয়ে বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর মনে হয়েছিল মা খুব খুশি হয়েছেন। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন তাঁর সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারিনি। এখন ভালো কিছু হলে মাকে জানাতে ইচ্ছে করে, কিন্তু তিনি আর নেই।’

তবুও থেমে থাকতে চান না কাউসার। জীবনের প্রতিটি বাধাকে তিনি নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হিসেবে দেখছেন। তাঁর লক্ষ্য পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া এবং মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো পূরণ করা।

চায়ের দোকানের শ্রমিক থেকে রিকশাচালক, আর সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী—কাউসারের পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি অভাবের মধ্যেও স্বপ্ন আঁকড়ে থাকার, শ্রমকে সম্মান করার এবং প্রতিকূলতার কাছে হার না মানার এক অনুপ্রেরণাদায়ী উদাহরণ। তাঁর হাতে এখন রিকশার হ্যান্ডেলের বদলে বই-খাতা; কিন্তু সেই বইয়ের প্রতিটি পাতায় মিশে আছে দীর্ঘ সংগ্রাম, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব এবং মায়ের স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয়।

 

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!