রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জীবিত মাকে মৃত দেখিয়ে জমি বিক্রির অভিযোগ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম

জীবিত মাকে মৃত দেখিয়ে জমি বিক্রির অভিযোগ

ছবিঃ সংগৃহীত

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলায় জীবিত মাকে কাগজপত্রে মৃত দেখিয়ে পৈতৃক বসতভিটাসহ ২১ শতক জমি বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তারই ছেলে আব্দুল জলিলের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি উপজেলার শেরপুর ইউনিয়নের রাজাবাড়িয়া গ্রামের। অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, রাজাবাড়িয়া গ্রামের মৃত জমসেদ আলীর ছেলে আব্দুল জলিলের মা রহিমা এখনো জীবিত এবং নিজ বাড়িতেই বসবাস করছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় সাত মাস আগে জুয়া খেলার অর্থের জোগান দিতে জলিল তার মাকে মৃত দেখিয়ে বসতভিটাসহ ২১ শতক জমি প্রতিবেশী মজিবুর রহমানের কাছে বিক্রি করে দেন।

ঘটনাটি প্রথমে পরিবারের বাইরে তেমনভাবে জানাজানি হয়নি। সম্প্রতি জমির ক্রেতা মজিবুর রহমান লোকজন নিয়ে ওই বাড়ির আশপাশের পানবরজ, বড় পুকুরসহ বিভিন্ন জায়গায় নিজের মালিকানা দাবি করে দখল নেওয়ার চেষ্টা করলে বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ তৈরি হয়। পরে নান্দাইল সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট দলিলের নকল সংগ্রহ করা হলে কথিত জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসে।

দলিলের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নান্দাইল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১১৫৪ ও ১১৫৫ নম্বরসহ সংশ্লিষ্ট দলিলের মাধ্যমে মোট ২১ শতক জমি নিবন্ধন করা হয়। জমির ক্রেতা হিসেবে নাম রয়েছে পূর্ব রাজাবাড়িয়া গ্রামের মৃত আমির হোসেনের ছেলে মজিবুর রহমানের। দলিলে সাক্ষী হিসেবে সই করেছেন একই গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে মো. হোসেন মিয়া। দলিলটি সম্পাদনের দায়িত্বে ছিলেন দলিল লেখক ঝন্টু সরকার।

শনিবার দুপুরে রাজাবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দলিলে মৃত হিসেবে উল্লেখ করা বৃদ্ধা রহিমা জীবিত অবস্থায় নিজের বাড়ির সামনেই বসে আছেন। ঘটনার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি ক্ষোভ ও কষ্ট প্রকাশ করেন। তার দাবি, তিনি জীবিত থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাকে মৃত দেখিয়ে তার বসতভিটা ও জমি বিক্রি করা হলো, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এ সময় রহিমার পাশে ছিলেন অভিযুক্ত জলিলের স্ত্রী নাছিমা বেগম, তার ছোট ছেলে অলি মিয়া, ছোট ছেলের স্ত্রী হাফছা বেগম এবং একমাত্র মেয়ে রোকিয়া বেগম।

নাছিমা বেগম অভিযোগ করেন, তার স্বামী জুয়া খেলায় আসক্ত। এর আগেও জুয়া খেলতে গিয়ে পরিবারের আরও কিছু জমি বিক্রি করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। নিজের স্বামীর কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, একজন জীবিত মানুষকে কাগজে মৃত দেখিয়ে তার সম্পত্তি বিক্রি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

অভিযুক্তের ছোট ভাই অলি মিয়ার দাবি, তার বড় ভাই দীর্ঘদিন ধরে জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। জুয়া খেলতে গিয়ে ধারদেনায় জড়িয়ে পড়ার পর একপর্যায়ে ওই দেনা পরিশোধের জন্য গোপনে মাকে মৃত দেখিয়ে জমি বিক্রি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুয়া মৃত্যুসনদ কীভাবে তৈরি হলো এবং নিবন্ধন কার্যালয়ে তা কীভাবে গ্রহণ করা হলো—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

তবে এ বিষয়ে দলিল লেখক ঝন্টু সরকার দাবি করেছেন, তার কাছে মৃত্যুসনদ ও ওয়ারিশসংক্রান্ত কাগজপত্র দেওয়া হয়েছিল। সেসব কাগজ দেখে তিনি দলিল সম্পাদন করেছেন। মৃত্যুসনদের সত্যতা যাচাই করা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে, স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. হামিদুল মৃত্যুসনদ ও ওয়ারিশসংক্রান্ত কাগজ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি এটিকে নিজের ভুল হিসেবে উল্লেখ করে বর্তমানে বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন।

জীবিত একজন নারীকে সরকারি নথিতে মৃত দেখিয়ে তার সম্পত্তি হস্তান্তরের অভিযোগ ওঠায় ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মৃত্যুসনদ তৈরির প্রক্রিয়া, ওয়ারিশসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং জমির দলিল নিবন্ধনের সময় সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা। একই সঙ্গে জীবিত রহিমার বসতভিটা ও জমির মালিকানা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তিও চান তারা।

 

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!