রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মৃ’ত্যুর আগে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির পাঁচ চিঠি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ১১:২৮ এএম

মৃ’ত্যুর আগে সাংবাদিক পুলক  চ্যাটার্জির পাঁচ চিঠি

ছবি: সংগৃহীত

বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচটি চিঠি উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে একটি চিঠিতে নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। বাকি চিঠিগুলো স্ত্রী, মেয়ে, ছোট ভাই ও তার স্ত্রী, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং দীর্ঘদিনের এক সহকর্মীকে উদ্দেশ করে লেখা বলে জানা গেছে। এসব চিঠিতে পরিবারের সদস্যদের কাছে ক্ষমা চাওয়া, তাদের খোঁজখবর রাখার অনুরোধ এবং নিজের দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বরিশাল নগরের প্যারারা রোডের একটি কার্যালয় থেকে পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ গিয়ে দরজা খুলে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে সুরতহাল শেষে রাতের দিকে মরদেহ বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ঘটনাটির কারণ উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। পাশাপাশি অপরাধ তদন্ত বিভাগের সদস্যরাও ঘটনাস্থলে কাজ করেছেন বলে জানা গেছে।

পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া পাঁচটি চিঠি পুলক চ্যাটার্জির নিজের লেখা বলে পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করেছেন। তবে চিঠিগুলোর বিষয়বস্তু, মৃত্যুর সঙ্গে এর সম্পর্ক এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

প্রশাসনের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে পুলক তার মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করার অনুরোধ করেন। দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নানা সমস্যায় ভোগার কথাও সেখানে উল্লেখ করেন তিনি। সুস্থ হওয়ার জন্য দেশে ও দেশের বাইরে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে চিঠিতে লিখেছেন। অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মরদেহ নিয়ে যেন পরিবারের সদস্যদের কোনো ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে না হয়, সে বিষয়েও প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান।

স্ত্রী ও মেয়েকে উদ্দেশ করে লেখা চিঠিতে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। মেয়েকে পড়াশোনার পাশাপাশি গান শেখা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। স্ত্রীকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থেকে জীবন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। ছোট ভাইয়ের প্রতি স্ত্রী ও মেয়ের পাশে থাকার দায়িত্ব পালনের অনুরোধও করেছেন তিনি। চিঠিগুলোতে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার উদ্বেগ ও আবেগের বিষয়টি ফুটে উঠেছে।

ছোট ভাই ও তার স্ত্রীকে উদ্দেশ করে লেখা চিঠিতে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেছেন পুলক। স্ত্রী ও মেয়ের দেখভাল করার পাশাপাশি নিজের কিছু আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। ভাইয়ের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি।

বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদককে লেখা চিঠিতে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও একসঙ্গে কাটানো বিভিন্ন স্মৃতির কথা উল্লেখ করেন পুলক। তার পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখার অনুরোধও করেন। দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে লেখা চিঠিতে একসঙ্গে বহু বছর কাজ করার স্মৃতি তুলে ধরে কোনো আচরণে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। পরিবারের পাওনা অর্থ আদায়ে সহযোগিতা করার অনুরোধও সেখানে ছিল বলে জানা গেছে।

পুলক চ্যাটার্জি বরিশালের সাংবাদিক মহলে পরিচিত মুখ ছিলেন। তিনি বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং মৃত্যুর সময় সংগঠনটির কার্যনির্বাহী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ছিলেন। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তার সক্রিয়তা ছিল।

জানা গেছে, কয়েক বছর আগে তিনি চাকরি হারানোর পর নিয়মিত কর্মজীবনের বাইরে ছিলেন। এরপরও মাঝে মাঝে পুরোনো কর্মস্থলের কার্যালয়ে যেতেন। সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং সেখানে সময় কাটাতেন। চাকরি হারানোর পর তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন বলে পরিচিতজনদের কেউ কেউ জানিয়েছেন। তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ শুধু এ বিষয়টির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বরিশাল মহানগর পুলিশের কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি চিঠি উদ্ধার হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন। পুলিশ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করছে। ময়নাতদন্ত ও তদন্তের পরই মৃত্যুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুতে বরিশালের সাংবাদিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন, পেশাগত ভূমিকা এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলোও এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!