প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ০২:১৩ পিএম
ভারতের মধ্যপ্রদেশের রেওয়া জেলার একটি সরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর এক নারী ও তার নবজাতক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর আগে ওই নারীর কান্না ও অসহায় অবস্থার একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নিহত নারীর নাম কল্পনা মিশ্র। বয়স ২৫ বছর। প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য গত ২৫ আগস্ট রাতে তাকে রেওয়ার সঞ্জয় গান্ধী স্মৃতি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি একটি সন্তান প্রসব করেন। এর কিছু সময় পরই মা ও নবজাতক দুজনের মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর আগে ধারণ করা ভিডিওতে কল্পনাকে হাসপাতালের নারী ওয়ার্ডে কান্নাকাটি করতে দেখা যায়। তিনি স্বজনদের কাছে যাওয়ার আকুতি জানাচ্ছিলেন এবং হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ভিডিওতে তাকে চিকিৎসা নিয়ে আতঙ্ক ও নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কার কথা বলতে শোনা যায়। কয়েকজন নার্স তাকে আটকে রাখার চেষ্টা করছেন বলেও ভিডিওতে দেখা যায়।
কল্পনার পরিবারের অভিযোগ, সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। তার বাবা রামশরণ মিশ্রের দাবি, মেয়ের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি চিকিৎসকদের বারবার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তার অভিযোগ, সেই অনুরোধ যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি।
পরিবারের আরও অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের সময় অচেতন করার ওষুধ দেওয়ার পর কল্পনার আর জ্ঞান ফেরেনি। তাকে অতিরিক্ত মাত্রায় ওই ওষুধ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে পরিবার। মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তার বাবা।
ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্বজনরা হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে তারা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। এ সময় হাসপাতাল এলাকায় কয়েক ঘণ্টা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পরে হাসপাতালের অধ্যক্ষ সুনীল আগরওয়াল ও হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক রাহুল মিশ্র ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্বজনদের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠকের পর মরদেহের ময়নাতদন্তে সম্মতি দেয় পরিবার।
ঘটনার পর দায়িত্বে থাকা দুই নার্স সাধনা ভার্মা ও সীমা মুজালদেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের অধ্যক্ষ সুনীল আগরওয়াল বলেন, মা ও শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। পরিবারের পক্ষ থেকে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো তদন্ত করে দেখা হবে। বিশেষ করে অচেতন করার ওষুধ দেওয়ার পর কল্পনার জ্ঞান কেন ফেরেনি, সেটিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রাহুল মিশ্র চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, চিকিৎসা নির্ধারিত নিয়ম অনুসারেই করা হয়েছে। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে কোনো অবহেলা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তবে পরিবারের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
ঘটনাটি সামনে আসার পর মধ্যপ্রদেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসক সংকটের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যটিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের বড় একটি অংশ শূন্য রয়েছে। ৫ হাজার ৪৪৩টি অনুমোদিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১ হাজার ৪৯৫ জন। অর্থাৎ ৩ হাজার ৯৪৮টি পদ খালি রয়েছে।
এ ছাড়া মেডিকেল কর্মকর্তার ৬ হাজার ৫১৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ২ হাজার ৬৮৯টি পদও শূন্য। ফলে জনবল সংকটের কারণে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা কতটা চাপের মধ্যে রয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
মা ও নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, তা তদন্ত প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হবে।



