রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কোনো হিন্দু যদি ভাবে ভারতে মুসলিম থাকবে না, তবে সে হিন্দু নয়: মোহন ভাগবত

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম

কোনো হিন্দু যদি ভাবে ভারতে মুসলিম থাকবে  না, তবে সে হিন্দু নয়: মোহন ভাগবত

সংগৃহীত

ভারতে মুসলমানদের কোনো স্থান থাকা উচিত নয়—এমন ধারণা পোষণকারী ব্যক্তি নিজেকে হিন্দু হিসেবে দাবি করতে পারেন না বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবত। তাঁর বক্তব্য, হিন্দুত্বের মূল দর্শনের সঙ্গে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়ার চিন্তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মানুষের ধর্ম, ভাষা কিংবা সংস্কৃতিতে ভিন্নতা থাকলেও মানবিক মর্যাদার ক্ষেত্রে সবাই সমান।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ‘এক বিশ্ব, এক মানবতা’ শীর্ষক একটি আন্তধর্মীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। সেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্মান এবং সামাজিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন ভাগবত।

ভাগবতের বক্তব্যের মূল সুর ছিল—ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষের মৌলিক পরিচয় এক। তাঁর মতে, হিন্দু দর্শনে বিভিন্ন ধর্মীয় পথকে স্বীকার করার পাশাপাশি সব মানুষের মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা রয়েছে। ফলে ভারতের মতো বহুধর্মীয় সমাজে কোনো একটি সম্প্রদায়কে দেশ থেকে বাদ দেওয়ার চিন্তা সেই দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি জানান, মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন ব্যক্তি তাকে একসময় প্রশ্ন করেছিলেন, ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে ভাবা হলে মুসলমানদের অবস্থান কী হবে। তাদের আশঙ্কা ছিল, এমন কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার অর্থ কি মুসলমানদের ভারত থেকে সরিয়ে দেওয়া? জবাবে ভাগবত স্পষ্ট করেন, হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণাকে মুসলমানদের বহিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় ঐতিহ্যের মধ্যে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতি এবং সহাবস্থানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

ভাগবত বলেন, মানুষের মধ্যে বিভাজনের জায়গাগুলোকে সামনে না এনে পারস্পরিক ঐক্যের জায়গাটি শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শুধু নিজের স্বার্থ, নিজের পরিচয় কিংবা নিজের গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে চিন্তা করলে সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ এবং ‘আমার’ থেকে ‘আমাদের’ চিন্তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই বৃহত্তর সমাধানের পথ রয়েছে বলে তিনি মত দেন।

ভারতের দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, দেশটির সামাজিক কাঠামোতে বিভিন্ন ধর্ম, মত ও সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে। এমনকি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা বা আশ্রয়ের সংকটে পড়া মানুষও অতীতে ভারতে এসে আশ্রয় পেয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাই ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে বাদ দেওয়ার মানসিকতা ভারতের ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলেও তিনি মত দেন।

ভাগবতের মতে, শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সমাজে স্থায়ী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক পরিসরে অনেক সময় ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রভাব বিস্তার করে। তাই সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে হবে মানুষের চিন্তা, শিক্ষা ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। সমাজের মানুষ যদি বিভেদ ও বিদ্বেষের পরিবর্তে সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সম্মানকে গুরুত্ব দেন, তাহলে রাজনৈতিক পরিসরেও তার প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন।

সমাজকে নিয়মিতভাবে শিক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমে ঐক্যের পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষকে যদি দীর্ঘ সময় ধরে বিভাজনমূলক চিন্তার প্রভাব থেকে দূরে রাখা না যায়, তাহলে সমাজে নানা ধরনের ভুল ধারণা ও দূরত্ব তৈরি হতে পারে। এ কারণে স্থানীয় পর্যায় থেকেই পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।

নিজের বক্তব্যের পক্ষে একটি পুরোনো দুর্ঘটনার ঘটনাও তুলে ধরেন ভাগবত। ১৯৯৬ সালে হরিয়ানার চরখি দাদরির আকাশে দুটি উড়োজাহাজের সংঘর্ষের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই দুর্ঘটনায় নিহতদের বড় একটি অংশ ছিলেন মুসলমান। দুর্ঘটনার পর সংঘের স্বেচ্ছাসেবকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আহতদের সহায়তা, মরদেহ উদ্ধারে সহযোগিতা এবং স্বজনদের কাছে মরদেহ শনাক্ত করার কাজে অংশ নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

ভাগবতের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় স্বেচ্ছাসেবকেরা দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়কে বিবেচনার বিষয় হিসেবে দেখেননি। বিপদে পড়া মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখেছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় কোনো বাধা হওয়া উচিত নয়।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও মানুষের মৌলিক মর্যাদা ও মানবিকতার জায়গাটি অভিন্ন। তাঁর মতে, এই উপলব্ধি সমাজে শক্তিশালী হলে ধর্মীয় বিভাজন অনেকটাই কমানো সম্ভব।

নিউইয়র্কের ওই অনুষ্ঠানে ভাগবত ভারতের বহুত্ববাদী সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক ঐক্যের ধারণা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে ভিন্নতার প্রতি সম্মান এবং মানুষের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি। তিনি মনে করেন, নিজস্ব পরিচয় ও বিশ্বাসকে সম্মান করার পাশাপাশি অন্যের পরিচয় ও বিশ্বাসের অধিকারকেও সমানভাবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।

মোহন ভাগবত বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্য সফর করছেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে তাঁর এই আন্তর্জাতিক সফরের আয়োজন করা হয়েছে। নিউইয়র্কের বক্তব্যে তিনি সংগঠনের সামাজিক কার্যক্রম, মানবিক সহায়তা এবং সমাজের মধ্যে ঐক্য তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

সব মিলিয়ে নিউইয়র্কের বক্তব্যে ভাগবতের প্রধান বার্তা ছিল—ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় সমাজে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়ার চিন্তা নয়, বরং ভিন্নতার মধ্যেই ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে সবাই সমান—এমন অবস্থানই তিনি তুলে ধরেছেন।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!