প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শুধু ইরানের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের বিরোধী শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। মুসলিম ঐক্য সপ্তাহ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি মুসলিম দেশগুলোর জনগণ ও সরকারকে নিজেদের মধ্যে বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
রোববার (৩০ আগস্ট) দেওয়া ওই বার্তায় খামেনি বলেন, মুসলমানদের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলার পথ পারস্পরিক সহযোগিতা, বন্ধুত্ব, ন্যায়বিচার ও অভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণের মধ্য দিয়ে তৈরি হতে পারে। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে এবং বিভিন্ন বিভাজনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।
খামেনির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কেবল ইরানের জনগণ কিংবা ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিরোধব্যবস্থার বিরোধী হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। তার দাবি, পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশও তাদের নীতির প্রভাবের বাইরে নয়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুসলিম দেশগুলোর শাসকদের প্রতি নিজেদের প্রকৃত প্রতিপক্ষ সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, কোনো কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হলেও বাস্তবে তারাও বিভিন্ন ধরনের চাপ ও অসম্মানের মুখোমুখি হচ্ছে।
খামেনি মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিভেদকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ধর্মীয় মতপার্থক্যের পাশাপাশি জাতিগত পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ভৌগোলিক অবস্থান—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে।
তার মতে, মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ যত বাড়বে, তাদের সম্মিলিত শক্তি তত দুর্বল হবে। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাইরের শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। তিনি মনে করেন, মুসলিম সমাজকে ছোট ছোট বিরোধে ব্যস্ত রেখে দীর্ঘমেয়াদে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা হতে পারে।
মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধেও কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন খামেনি। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সচেতনভাবে কিংবা অজ্ঞতাবশত মুসলিমদের মধ্যে সংঘাত ও বিভাজন বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিলে তা শেষ পর্যন্ত ইসলামবিরোধী শক্তির স্বার্থকে এগিয়ে দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে মুসলমানদের নিজেদের অবস্থান নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তার দাবি, আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করা শক্তিগুলো তাদের উদ্দেশ্য আগের তুলনায় বেশি প্রকাশ্যে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
ফিলিস্তিন পরিস্থিতির প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। তিনি প্রশ্ন করেন, মুসলিম দেশ ও জনগণ যদি আরও ঐক্যবদ্ধ থাকত, তাহলে ফিলিস্তিনের মানুষের ওপর চলমান নিপীড়ন ও সংকটের পরিস্থিতি এতটা কঠিন হতো কি না।
তার বক্তব্যে ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত দায়িত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে পারত এবং বিভিন্ন সংকটে সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হতো।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সম্পদের বিষয়টিও নিজের বক্তব্যে তুলে ধরেন খামেনি। তার ভাষ্য, ওই অঞ্চলের দেশগুলোর সরকার ও জনগণ যদি পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে বাইরের কোনো শক্তির পক্ষে তাদের ভূখণ্ড ও সম্পদের ওপর সহজে প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হবে না।
তিনি মুসলিম বিশ্বের সামনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরেন। প্রথমত, মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে হবে এবং বিভেদ সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোনো মুসলিম দেশ বা জনগোষ্ঠী হুমকি বা সংকটে পড়লে অন্যদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
খামেনির মতে, মুসলিম বিশ্বের অগ্রগতির জন্য শুধু রাজনৈতিক ঐক্য যথেষ্ট নয়। জ্ঞান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং সামাজিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেও সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে তাদের সামগ্রিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, মুসলিম সভ্যতার ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে পারস্পরিক বিরোধ কমিয়ে অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। একে অন্যের দুর্বলতা নিয়ে প্রতিযোগিতা না করে সম্মিলিত উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, বাইরের শক্তির বিরোধিতা করার আগে মুসলিম সমাজের নিজেদের মধ্যকার বিভেদ কমানো প্রয়োজন।
তবে খামেনির এসব বক্তব্য তার নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পুরো মুসলিম বিশ্বের শত্রু হিসেবে দেখার বিষয়টি তার বক্তব্যের অংশ; এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সর্বসম্মত কোনো মূল্যায়ন নয়।
মুসলিম ঐক্য সপ্তাহ উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় শেষ পর্যন্ত খামেনির মূল আহ্বান ছিল—ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও সংহতি বাড়াতে হবে। তার মতে, বিভক্তির পরিবর্তে সম্মিলিত উদ্যোগই মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পথ তৈরি করতে পারে।
মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংকট, বিশেষ করে ফিলিস্তিন পরিস্থিতি ও পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা ধরনের উত্তেজনা ও মতবিরোধ রয়েছে, তখন খামেনির এই বক্তব্যে আবারও মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক ঐক্য ও সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এসেছে।



