প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন এক মাইলফলক তৈরি হয়েছে। জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি মানবদেহে প্রতিস্থাপনের পর ৯ মাসের কাছাকাছি সময় সফলভাবে কার্যকর ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ৬৬ বছর বয়সী টিম অ্যান্ড্রুস নামের এক ব্যক্তি ওই কিডনি নিয়ে ২৭১ দিন কোনো কিডনি প্রতিস্থাপনজনিত জটিলতা ছাড়াই এবং নিয়মিত রক্ত পরিশোধন চিকিৎসা ছাড়াই জীবনযাপন করেছেন। পরে তাঁর শরীরে একজন মানবদাতার কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটিকে প্রাণীর অঙ্গ ব্যবহার করে মানবদেহকে মানবদাতার অঙ্গ পাওয়ার সময় পর্যন্ত কার্যকর রাখার গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অ্যান্ড্রুসের দুই কিডনিই শেষ পর্যায়ের কিডনি অকার্যকারিতায় আক্রান্ত হয়ে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের দ্বিতীয় ধরনের বহুমূত্র রোগজনিত জটিলতা। তাঁর ক্ষেত্রে উপযুক্ত মানব কিডনি পাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল অত্যন্ত কম। চিকিৎসকদের হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে উপযুক্ত মানব কিডনি পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল মাত্র ৯ শতাংশের মতো। অন্যদিকে কিডনি প্রতিস্থাপন না হলে তাঁর জীবনঝুঁকিও ছিল উল্লেখযোগ্য।
এমন পরিস্থিতিতে মানবদাতার কিডনির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার পরিবর্তে তাঁকে পরীক্ষামূলক চিকিৎসার আওতায় আনা হয়। জিনগতভাবে পরিবর্তিত ইউকাটান জাতের ক্ষুদ্র আকৃতির একটি শূকর থেকে নেওয়া কিডনি তাঁর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। শূকরটির নাম ছিল উইলমা। মানবদেহের প্রতিরোধব্যবস্থা যাতে সহজে ওই অঙ্গকে প্রত্যাখ্যান না করে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে, সে উদ্দেশ্যে কিডনিটির জিনগত বৈশিষ্ট্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
প্রতিস্থাপনের পর অঙ্গটি মানব কিডনির মতোই রক্ত থেকে বর্জ্য অপসারণ এবং মূত্র তৈরির কাজ করতে থাকে। এর ফলে অ্যান্ড্রুসকে দীর্ঘ সময় ধরে রক্ত পরিশোধন যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়নি। নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। প্রায় নয় মাস ধরে ওই কিডনি তাঁর শরীরে কার্যকর থাকার পর ধীরে ধীরে এর কর্মক্ষমতা কমতে শুরু করে।
২৭১ দিন পর শূকরের কিডনিটি সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর কিছু সময় রক্ত পরিশোধন চিকিৎসার ওপর থাকার পর অ্যান্ড্রুসের শরীরে মানবদাতার একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। এটিও সফলভাবে কাজ করতে শুরু করে। ফলে একই রোগীর ক্ষেত্রে প্রথমে শূকরের কিডনি এবং পরে মানব কিডনি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে চিকিৎসার একটি নতুন সম্ভাবনা সামনে এসেছে।
বিশ্বজুড়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হলেও প্রয়োজনের তুলনায় মানবদাতার অঙ্গের সরবরাহ কম। দীর্ঘদিন ধরে এই সংকট মোকাবিলায় প্রাণীর অঙ্গ মানুষের শরীরে ব্যবহারের বিষয়ে গবেষণা চলছে। তবে প্রাণীর অঙ্গ মানবদেহে প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থার প্রত্যাখ্যান, সংক্রমণ এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এর আগে শূকরের কিডনি মানবদেহে প্রতিস্থাপনের কয়েকটি পরীক্ষায় সীমিত সময়ের সাফল্য পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু অ্যান্ড্রুসের ক্ষেত্রে ২৭১ দিন অঙ্গটির কার্যকর থাকা নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। গবেষকদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শূকরের কিডনিটি স্থায়ী বিকল্প হিসেবে নয়, বরং মানব কিডনি পাওয়ার আগ পর্যন্ত রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার একটি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর হতে পারে—এমন সম্ভাবনার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে জিনগতভাবে পরিবর্তিত প্রাণীর অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে মানবদাতার অঙ্গের সংকট মোকাবিলায় নতুন পথ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের চিকিৎসা এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা ও বড় পরিসরের পরীক্ষার প্রয়োজন।
অ্যান্ড্রুসের ঘটনা তাই শুধু একজন রোগীর জীবন রক্ষার নজির নয়; একই সঙ্গে মানবদাতার অঙ্গের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষারত রোগীদের ক্ষেত্রে প্রাণীর অঙ্গকে সাময়িক বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অগ্রগতি ভবিষ্যতে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে।



