রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

‘চোরেদের গ্রাম’ থেকে প্রথম চিকিৎসক হওয়ার পথে প্রতিবন্ধী কালিমুল্লা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম

‘চোরেদের গ্রাম’ থেকে প্রথম চিকিৎসক হওয়ার পথে প্রতিবন্ধী কালিমুল্লা

ছবিঃ সংগৃহীত

একসময় যে গ্রামের পরিচয় জড়িয়ে ছিল ‘মিনি চম্বল’ কিংবা ‘চোরেদের গ্রাম’ নামে, সেই পুনিশোল থেকেই এবার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়লেন কালিমুল্লা মণ্ডল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও নানা প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে জাতীয় পর্যায়ের চিকিৎসাশাস্ত্রের ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। মেধা, পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের জোরে ইতোমধ্যে বাঁকুড়া সম্মিলনী চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন কালিমুল্লা।

বাঁকুড়া জেলার ওন্দা এলাকার পুনিশোল একটি বড় গ্রাম। এখানে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের বসবাস। আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল গ্রামটি। স্থানীয়দের বড় একটি অংশ ফেরি করে বিভিন্ন পণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। অনেকে কৃষিকাজের ওপরও নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি।

এই বাস্তবতার কারণেই একসময় পুনিশোলের সঙ্গে নেতিবাচক নানা পরিচয় জুড়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই কালিমুল্লাকেও এমন মন্তব্য শুনতে হয়েছে যে, এই গ্রামে পড়াশোনার পরিবেশ নেই এবং এখানকার তরুণদের ভবিষ্যৎ ভালো নয়। কিন্তু সেই ধারণাকেই নিজের সাফল্যের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করেছেন তিনি।

কালিমুল্লার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর পথচলায়ও নানা বাধা তৈরি করেছিল। তাঁর ৬০ শতাংশ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং ছোটবেলা থেকেই পায়ের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে কখনো নিজের স্বপ্নের চেয়ে বড় করে দেখেননি তিনি। নিয়মিত পড়াশোনা, অধ্যবসায় এবং লক্ষ্য ধরে রাখার মধ্য দিয়েই এগিয়ে গেছেন।

২০২৩ সালে পুনিশোল বোর্ড উচ্চবিদ্যালয় থেকে ৬৪৬ নম্বর পেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন কালিমুল্লা। এরপর বাঁকুড়া বঙ্গ বিদ্যালয় থেকে ৪৪০ নম্বর পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। উচ্চমাধ্যমিকের পর সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে শুরু করেন কঠোর প্রস্তুতি।

চিকিৎসাশাস্ত্রের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কোনো নির্দিষ্ট কোচিং প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেননি কালিমুল্লা। নিজ উদ্যোগেই পড়াশোনার পরিকল্পনা তৈরি করেন। বিভিন্ন অনলাইন শিক্ষাক্রম থেকে পাঠ নেন, সেখান থেকে প্রয়োজনীয় নোট তৈরি করেন। পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষাক্রমের পাঠ্যবই গভীরভাবে পড়েন এবং নিয়মিত বহুনির্বাচনী প্রশ্নের অনুশীলন করেন। প্রস্তুতির মান যাচাই করতে বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নিয়েও নিজের দুর্বলতা খুঁজে বের করতেন।

শেষ পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রমের ফলও পেয়েছেন তিনি। ভর্তি পরীক্ষায় সারা দেশের মধ্যে ৫৮ হাজার ৪০০তম স্থান এবং রাজ্য পর্যায়ে প্রায় আট হাজারের কাছাকাছি স্থান অর্জন করেন। এর ভিত্তিতে বাঁকুড়া সম্মিলনী চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। পুনিশোল গ্রামের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো তরুণ চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক হওয়ার পথে এগিয়ে গেলেন।

নিজের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত কালিমুল্লা মনে করেন, সততা ও পরিশ্রম থাকলে কোনো বাধাই শেষ পর্যন্ত মানুষকে থামিয়ে রাখতে পারে না। নিজের গ্রামের পরিচিতি বদলে দিতে পারায় তিনি গর্বিত। ভবিষ্যতে গলায় চিকিৎসকের পরিচয়ের প্রতীক ঝুলিয়ে মানুষের সেবা করার পাশাপাশি শল্যচিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ হওয়ারও স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

কালিমুল্লার বাবা বুয়ালী কলন্দর মণ্ডল একজন সাবেক সরকারি কর্মী। নয় ভাই-বোনের মধ্যে কালিমুল্লা সবার ছোট। ছেলের সাফল্যে গর্বিত বাবা জানিয়েছেন, গ্রামের ওপর দীর্ঘদিন যে নেতিবাচক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা পুরোপুরি বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি নয়। কয়েকজনের কর্মকাণ্ডের কারণে একটি পুরো গ্রামের মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করা ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে গ্রামে এখনো শিক্ষার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন তিনি। সেই ঘাটতির কারণে অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তাঁর প্রত্যাশা, ছেলে চিকিৎসক হয়ে একদিন গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়াবে এবং অন্যদেরও শিক্ষার প্রতি উৎসাহিত করবে।

কালিমুল্লার সাফল্যে আনন্দিত পুনিশোলের বাসিন্দারাও। স্থানীয়দের মতে, তাঁর অর্জন গ্রামের তরুণ প্রজন্মের সামনে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। যে গ্রামের সঙ্গে একসময় নেতিবাচক পরিচয় জড়িয়ে ছিল, সেই গ্রামেরই একজন তরুণ এখন চিকিৎসক হওয়ার পথে—এটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, পুরো এলাকার জন্য গর্বের বিষয়।

পুনিশোল বোর্ড উচ্চবিদ্যালয়ের সহশিক্ষক বিবেকরঞ্জন মাজির ভাষায়, কালিমুল্লার এই অর্জন গ্রামের জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। অন্ধকার ও নেতিবাচক পরিচয় পেছনে ফেলে শিক্ষার আলোয় এগিয়ে যাওয়ার পথে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।

কালিমুল্লার গল্প তাই শুধু একজন শিক্ষার্থীর ভর্তি পরীক্ষায় সফল হওয়ার ঘটনা নয়। এটি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, আর্থসামাজিক সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক কুসংস্কারকে জয় করে স্বপ্ন পূরণের গল্প। তাঁর সাফল্য এখন পুনিশোলের বহু ছেলে-মেয়েকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য লড়াই করতে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!