প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম
রাজধানীর মিরপুর ও কালসী এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, খাল দখল ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে এবার কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)।
স্পষ্ট ভাষায় ডিএনসিসি প্রশাসক মোঃ শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, “গুটিকয়েক মানুষের জন্য পুরো মিরপুরবাসী কষ্ট করবে—এটা হতে পারে না।জনগণের টাকা খরচ করে আমরা প্রতিদিন খাল পরিষ্কার করবো, আর পরের দিন আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে—সেটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।”বুধবার সকালে রাজধানীর কালসী এলাকায় সাংবাদিক কলোনি খালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় ডিএনসিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, পরিচ্ছন্নতা বিভাগের সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।
জলাবদ্ধতায় নাকাল মিরপুরবাসী:
রাজধানীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা মিরপুর, কালসী, পল্লবী ও আশপাশের এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যাওয়ার ঘটনা এখন নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খাল দখল, ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়া, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে- রাজধানীর প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ হিসেবে ব্যবহৃত বহু খাল ইতোমধ্যে সংকুচিত বা দখল হয়ে গেছে। কোথাও খালের ওপর স্থাপনা, কোথাও ড্রেনের মুখ বন্ধ, আবার কোথাও বর্জ্যের স্তূপ জমে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে আছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।
খাল উদ্ধার ছাড়া বিকল্প নেই:
ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে খালটি অব্যবস্থাপনার কারণে এলাকাবাসী চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
আমরা একাধিকবার পরিষ্কার করেছি, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। তাই এবার স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “খাল উদ্ধার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখতে হলে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতেই হবে। যারা অবৈধভাবে খালের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন, তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে না সরালে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়েই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
প্রশাসকের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শুধুমাত্র অস্থায়ী পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়—বরং স্থায়ীভাবে খাল পুনরুদ্ধার, পানি প্রবাহ সচল রাখা এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দিকেই এগোচ্ছে ডিএনসিসি।
এক সপ্তাহের বিশেষ পরিষ্কার অভিযান:
ডিএনসিসি সূত্র জানায়, আপাতত আগামী এক সপ্তাহ সাংবাদিক কলোনি খাল ও আশপাশের ড্রেনেজ লাইনে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। ভারী যন্ত্রপাতি, শ্রমিক ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মাধ্যমে খালের ময়লা, পলিথিন, প্লাস্টিক বর্জ্য ও জমে থাকা পলি অপসারণ করা হবে।এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিক সমিতি, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের রূপরেখা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ড্রেন বা খাল ময়লা ফেলার জায়গা নয়:
খাল ও ড্রেন দূষণের জন্য সাধারণ মানুষের অসচেতনতাকেও দায়ী করেন ডিএনসিসি প্রশাসক। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ড্রেন বা খাল কখনোই ময়লা ফেলার জায়গা নয়।যারা এখানে বসবাস করেন, তাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সবাই সচেতন না হলে শুধু পরিষ্কার করেই স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।”
পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন খাল থেকে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, পলিথিন, নির্মাণ বর্জ্য, গৃহস্থালির আবর্জনা ও নষ্ট আসবাবপত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় খালের স্বাভাবিক প্রস্থও কমে গেছে অবৈধ দখলের কারণে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের সতর্কবার্তা:
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদরা বলছেন, রাজধানীর খাল ও জলাধার রক্ষা না করা গেলে ভবিষ্যতে ঢাকায় জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল ভরাট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা রাজধানীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।তাদের মতে, শুধুমাত্র উচ্ছেদ অভিযান নয়—খাল সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা, নিয়মিত মনিটরিং, নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা—কথায় নয়, কাজে সমাধান চাই:
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বহু বছর ধরেই তারা জলাবদ্ধতা ও দুর্ভোগের শিকার। বর্ষা মৌসুম এলেই ঘরবাড়ি, সড়ক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ে। শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের চলাচল হয়ে পড়ে দুর্বিষহ।
তাদের প্রত্যাশা, এবার যেন শুধু অভিযান বা ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবেই খাল উদ্ধার, ড্রেনেজ সংস্কার ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা হয়।
রাজধানীর টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিবেশ রক্ষায় খাল পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ এখন নগরবাসীর জন্য বড় এক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ডিএনসিসির ঘোষিত কঠোর অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়—সেদিকেই তাকিয়ে মিরপুরবাসী।



