রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিতে কঠোর অবস্থানে ব্রিটেন

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬, ০৫:২২ পিএম

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিতে কঠোর অবস্থানে ব্রিটেন

ছবিঃ সংগৃহীত

ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটি জানিয়েছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে তারা অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ, বসতি সম্প্রসারণে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাজ্যে এসব বসতির প্রচার নিষিদ্ধ করার মতো একাধিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বুধবার ব্রিটিশ সংসদের নিম্নকক্ষে দেওয়া এক বক্তব্যে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড এসব পদক্ষেপের কথা জানান। তিনি বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ও ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করেই যুক্তরাজ্য দায়িত্ব শেষ করবে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে ব্রিটিশ সরকারের এই অবস্থান ইসরায়েলি জনগণ বা ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয় বলেও স্পষ্ট করেছেন মিলিব্যান্ড। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের অধিকারকে সমর্থনের পাশাপাশি ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতা ও নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারকেও সমর্থন করে যুক্তরাজ্য। দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকেই সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে দেখছে দেশটি।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ওই অঞ্চলে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। তার অভিযোগ, বসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া, উচ্ছেদ, কৃষিজমিতে প্রবেশে বাধা এবং সহিংসতার ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি জানান, ২০২৩ সাল থেকে পশ্চিম তীরের ৬৫টি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মকাণ্ডের কারণে চার হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিজেদের বাড়িঘর হারিয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিশেষ করে পশ্চিম তীরের ই-১ নামে পরিচিত এলাকায় ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ সরকারের আশঙ্কা, ওই এলাকায় বসতি নির্মাণ অব্যাহত থাকলে পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ইসরায়েলি বসতির একটি ধারাবাহিক অঞ্চল গড়ে উঠতে পারে। এর ফলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক সংযোগ আরও দুর্বল হবে এবং ভবিষ্যতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও জটিল হয়ে পড়বে।

বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ঠেকাতেও নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত আরও কয়েকজন উগ্রপন্থি বসতি স্থাপনকারীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যারা অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে অর্থায়ন বা অন্য কোনোভাবে সহযোগিতা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ছয় থেকে নয় মাসের মধ্যে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার কথা জানানো হয়েছে। বসতি নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থায়ন ও আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কিছু ধর্মীয় প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার থাকলেও সেই অধিকারের দোহাই দিয়ে গাজায় সংঘটিত সব কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া যায় না। গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি, মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং অবকাঠামো ধ্বংসের বিষয় উল্লেখ করে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।

একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ গাজার শাসনব্যবস্থায় হামাসের কোনো ভূমিকা থাকা উচিত নয় বলে মত দিয়েছেন তিনি। হামাসকে অস্ত্র ত্যাগ করতে হবে এবং তাদের সামরিক অবকাঠামো বিলুপ্ত করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

গাজার মানবিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়তা বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটির সহায়তায় পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং গুরুতর আহত শিশুদের চিকিৎসায় ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞদের সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্রিটিশ সরকারের নতুন নীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা ধরে রাখার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। দেশটির বক্তব্য, একদিকে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল—দুই রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা বলা এবং অন্যদিকে এমন কর্মকাণ্ড চলতে দেওয়া, যা সেই সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে, এই দ্বৈত অবস্থান থেকে সরে আসতে চায় যুক্তরাজ্য। তাই অবৈধ বসতি থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ, বসতির প্রচার নিষিদ্ধ এবং বসতি সম্প্রসারণে সহযোগিতাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে নতুন নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!