রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে শহিদদের স্মরণে তিন বছর পর মাঠে ফিরল ফিলিস্তিনের ফুটবল

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম

ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে শহিদদের স্মরণে তিন বছর পর মাঠে ফিরল ফিলিস্তিনের ফুটবল

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর আবারও প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ফিরেছে ফিলিস্তিন। যুদ্ধের ভয়াবহতা, ধ্বংসপ্রাপ্ত ক্রীড়া স্থাপনা এবং অসংখ্য ক্রীড়াবিদের প্রাণহানির মধ্যেও মাঠে গড়িয়েছে ক্লাব পর্যায়ের ফুটবল। শহিদ ক্রীড়াবিদদের স্মরণে বিশেষ এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে, যার উদ্বোধনী ম্যাচ একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা ও লেবাননের শরণার্থী শিবিরে।

ফিলিস্তিনি ফুটবল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার নাম দেওয়া হয়েছে ‘হাজার শহিদের কাপ’। যুদ্ধের সময় প্রাণ হারানো ক্রীড়াবিদ, কোচ ও ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এমন নামকরণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা সংঘাতের পর এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদ নিহত হয়েছেন। একই সময়ে বহু ক্রীড়া স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই ফুটবলকে আবার মাঠে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে ফিলিস্তিন। পশ্চিম তীর, গাজা ও প্রবাসী ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে মোট ২৪৪টি ক্লাব এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। গত ১ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন শাখায় একযোগে প্রতিযোগিতার দলবিন্যাসের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এরপর ৪ সেপ্টেম্বর তিনটি অঞ্চলে একই সময়ে উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত এই আসর।

পশ্চিম তীরে জেরুজালেমের উত্তরে আল-রাম শহরের ফয়সাল আল-হুসেইনি আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয় জাবাল আল-মুকাবের ও শাবাব আল-খলিল। গাজায় মধ্যাঞ্চলের দেইর আল-বালাহ এলাকায় খাদামাত রাফাহ ও শাবাব রাফাহর মধ্যে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। আর লেবাননের আইন আল-হিলওয়া শরণার্থী শিবিরে আল-আনসার ও আল-নাহদার মধ্যেও মাঠে গড়ায় উদ্বোধনী লড়াই।

একই সময়ে তিন ভিন্ন অঞ্চলে খেলা শুরু হওয়ার বিষয়টি ফিলিস্তিনি ফুটবলের বর্তমান বাস্তবতাকেও তুলে ধরেছে। যুদ্ধ ও চলাচলের নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলের খেলোয়াড় ও দলগুলোর একত্র হওয়া কঠিন। তাই আলাদা অঞ্চলে প্রতিযোগিতা চালুর মাধ্যমে ফুটবল কার্যক্রমকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

ফিলিস্তিনে ঘরোয়া ফুটবল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রায় তিন মৌসুম মাঠে নিয়মিত ক্লাব প্রতিযোগিতা দেখা যায়নি। যুদ্ধ শুধু খেলাধুলার আয়োজন থামিয়ে দেয়নি, এর অবকাঠামোকেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিভিন্ন মাঠ ও ক্রীড়া স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিয়মিত অনুশীলন এবং প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এর মধ্যেও নতুন করে ফুটবল আয়োজনকে কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন না ফিলিস্তিনের ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের কাছে এটি স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষা, নিজেদের অস্তিত্বের প্রকাশ এবং নিহত ক্রীড়াবিদদের স্মরণ করার একটি প্রতীকী উদ্যোগ। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও মাঠে বল গড়ানোর দৃশ্য তাই ফিলিস্তিনিদের জন্য আলাদা তাৎপর্য বহন করছে।

প্রতিযোগিতার নামের মধ্যেও সেই স্মৃতি ধরে রাখা হয়েছে। ফিলিস্তিনি ফুটবল কর্তৃপক্ষের হিসাবে যুদ্ধের সময়ে নিহত এক হাজারের বেশি ক্রীড়াবিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘হাজার শহিদের কাপ’ নামটি বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিহত খেলোয়াড় ও ক্রীড়াঙ্গনের ব্যক্তিদের স্মরণ করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের মাঠে ফেরানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ফিলিস্তিনি ক্রীড়া কর্মকর্তারা মনে করেন, দীর্ঘ বিরতির পর ঘরোয়া ফুটবলের এই প্রত্যাবর্তন ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের কারণে অনেক তরুণ খেলোয়াড় নিয়মিত খেলার সুযোগ হারিয়েছেন। আবার অনেকে বাস্তুচ্যুতি, আহত হওয়া কিংবা স্বজন হারানোর মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। এমন অবস্থায় ফুটবল মাঠে ফেরার উদ্যোগ তাদের জন্য মানসিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

যুদ্ধের ক্ষত এখনো স্পষ্ট হলেও ফুটবল আবারও মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বাভাবিকতার অনুভূতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। গাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ, পশ্চিম তীরের কঠিন পরিস্থিতি কিংবা লেবাননের শরণার্থী শিবির—সব জায়গাতেই একই বার্তা তুলে ধরছে এই আয়োজন। প্রতিকূলতার মধ্যেও খেলা থেমে থাকবে না, এমন প্রত্যয়ই যেন ফুটবল মাঠে প্রকাশ পাচ্ছে।

ফিলিস্তিনের ক্রীড়া অঙ্গনে এই প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একটি নতুন প্রতিযোগিতার সূচনা নয়; বরং যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও জীবন ও স্বপ্নকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতীক। শহিদ ক্রীড়াবিদদের স্মৃতিকে সামনে রেখে শুরু হওয়া এই ফুটবল প্রতিযোগিতা ফিলিস্তিনের মানুষের কাছে নতুন করে মাঠে ফেরার পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া সহযোদ্ধাদের স্মরণ করারও একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!