প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬, ০২:১৬ পিএম
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীর ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন মানিকদি নামাপাড়ায় মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন ‘ওয়েলনেস ফাউন্ডেশন’। সমাজের অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সংগঠনটি সোমবার সকালে শতাধিক পরিবারের মাঝে কুরবানির গোশত বিতরণ করেছে। ঈদের আগেই এমন উদ্যোগে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে মানবিকতার উজ্জ্বল আবহ, আর বহু দরিদ্র পরিবারের মুখে ফুটেছে স্বস্তি ও আনন্দের হাসি।
সকাল থেকেই মানিকদি নামাপাড়া এলাকায় ছিল উৎসবমুখর কিন্তু শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ। ওয়েলনেস ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা ধর্মীয় বিধান, স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি গরু কুরবানি সম্পন্ন করেন। পরে গোশত ওজন করে তালিকাভুক্ত দরিদ্র, দিনমজুর, রিকশাচালক, বিধবা, বয়স্ক ও শ্রমজীবী পরিবারের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
সংগঠনের দায়িত্বশীলরা জানান, সামর্থ্যবানদের ঈদের আনন্দ যেন সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কাছেও পৌঁছে যায়—এই চিন্তা থেকেই তাদের এই আয়োজন। শুধু গোশত বিতরণ নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য।
সংগঠনটির চেয়ারম্যান হানিফ গাজী বলেন-
“ঈদ শুধু উৎসবের নাম নয়, এটি ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবতার শিক্ষা দেয়। সমাজের অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই আমাদের এই আয়োজন সফল হবে। আমরা চাই সমাজের প্রতিটি সামর্থ্যবান মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াক। মানুষের দোয়া ও ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।”
ওয়েলনেস ফাউন্ডেশনের এক প্রতিনিধি বলেন-
“ঈদ মানে শুধু ব্যক্তিগত আনন্দ নয়, বরং সবার সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার শিক্ষা। সমাজের অনেক মানুষ আছেন যারা বছরজুড়ে ভালো খাবার তো দূরের কথা, ঈদের সময়ও কুরবানির গোশত পান না। আমরা চেয়েছি অন্তত কিছু মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। মানুষের দোয়া ও ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ঈদের সময়টাও অনেক কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উচ্চমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক পরিবার কুরবানি দেওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না। সেখানে ওয়েলনেস ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগ তাদের জন্য এক বড় স্বস্তি হয়ে এসেছে।
গোশত নিতে আসা এক বৃদ্ধা নারী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন,
“আমার ছেলেরা আলাদা থাকে, সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। ঈদের সময় বাচ্চাদের জন্য একটু মাংস কিনতেও পারি না। আজ যে গোশত পেলাম, এতে অন্তত ঈদের দিনটা ভালো কাটবে।”
আরেক শ্রমজীবী ব্যক্তি বলেন,
“এভাবে সম্মানের সাথে সাহায্য পাওয়াটা অনেক বড় বিষয়। এখানে কাউকে ছোট করা হয়নি, বরং আন্তরিকভাবে সবার হাতে গোশত তুলে দেওয়া হয়েছে।”
স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তারা বলেন, সামাজিক বৈষম্য কমাতে এবং মানবিক সমাজ গঠনে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে তরুণদের সামাজিক ও মানবিক কাজে সম্পৃক্ত করতে এমন কার্যক্রম অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে।
জানা গেছে, ওয়েলনেস ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় শীতবস্ত্র বিতরণ, খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা সহযোগিতা, রক্তদান কর্মসূচি, দুর্যোগকালীন ত্রাণ বিতরণ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সহায়তাসহ নানা মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সংগঠনটির সদস্যদের বড় অংশই তরুণ স্বেচ্ছাসেবক, যারা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় মানবিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে অসহায় মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে।
ঈদের আগে মানিকদির এই ছোট্ট আয়োজন তাই শুধু গোশত বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে মানবতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই বার্তাই ছড়িয়ে পড়ুক সমাজের প্রতিটি স্তরে—এমন প্রত্যাশাই স্থানীয়দের।



