প্রকাশিত: আগস্ট ২৯, ২০২৬, ০৮:৪০ এএম
নারায়ণগঞ্জের একটি সিটি পার্কে প্রকাশ্যে বন্দুকের মতো দেখতে অস্ত্র হাতে দুই তরুণের ঘোরাফেরার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় ৩৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে তাদের কখনো পার্কের ভেতরে, কখনো ব্যস্ত সড়কের পাশে এবং কখনো দোকানের সামনে অবস্থান করতে দেখা যায়। এ সময় তারা আশপাশের পথচারী, রিকশাচালক এমনকি একটি শিশুর দিকেও বন্দুক তাক করছেন বলে ভিডিওতে দেখা গেছে।
বন্দুকের মতো অস্ত্র হঠাৎ কারও দিকে তাক করা হলে পথচারীদের কেউ সরে যাচ্ছেন, কেউ থেমে যাচ্ছেন, আবার কেউ আতঙ্কিত হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকছেন। একটি দৃশ্যে শিশুকেও অস্ত্রের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠতে দেখা যায়। এ ধরনের দৃশ্য ধারণ করে প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২০ আগস্ট ‘ওয়াফি লিমন’ নামে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতা থেকে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। পরে এটি দ্রুত বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে থাকা দুই তরুণের একজন লিমন তোহা এবং অপরজন মো. ইয়াসিন বলে জানা গেছে। তাদের দুজনেরই বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায়।
ভিডিওটির বিষয়ে লিমন তোহার দাবি, এতে ব্যবহৃত দুটি বন্দুকই খেলনা। মানুষের মধ্যে তাৎক্ষণিক আতঙ্ক ও প্রতিক্রিয়া ধারণ করাই ছিল ভিডিও তৈরির উদ্দেশ্য। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত বিভিন্ন প্রবণতা দেখে তাঁরা এমন একটি মজার ভিডিও তৈরির পরিকল্পনা করেন।
লিমনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিওতে মানুষের ভয় পাওয়ার দৃশ্যগুলো রাখা হলেও পরে তারা স্বাভাবিকভাবে হাসাহাসি ও মজা করেছেন—এমন অংশ প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ভিডিওটি দেখে অনেকেই ঘটনাটিকে বাস্তব অস্ত্র প্রদর্শন এবং সাধারণ মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভয় দেখানোর ঘটনা হিসেবে ধরে নিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র ও নাটকের দৃশ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা ধরনের ভিডিও দেখে তিনি এ ধরনের বিষয়বস্তু তৈরিতে আগ্রহী হন। প্রথমে ভিডিওটি একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাবে প্রকাশ করা হয়। পরে নিজের অন্য দুটি হিসাবেও তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে প্রকাশ্য স্থানে খেলনা হলেও বন্দুকের মতো দেখতে কোনো বস্তু ব্যবহার করে মানুষকে ভয় দেখানো কতটা গ্রহণযোগ্য—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে শিশু, পথচারী ও সাধারণ মানুষের দিকে অস্ত্র তাক করার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার আওতাধীন এলাকায় ঘটেছে বলে জানা গেছে। যদিও ভিডিওতে থাকা দুই তরুণের বসবাস বন্দর থানা এলাকায়। ফলে ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দুই থানা ও পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, ভিডিওটি তাঁদের নজরে এলে প্রথমে সেখানে ব্যবহৃত অস্ত্রের প্রকৃতি ও বৈধতা যাচাই করা হবে। অস্ত্রগুলো সত্যিকার আগ্নেয়াস্ত্র হলে সেগুলোর বৈধ কাগজপত্র বা অনুমোদন রয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হবে।
তিনি বলেন, ব্যবহৃত অস্ত্র বৈধ না হলে কিংবা সেগুলো খেলনা হলেও ভিডিওতে যেভাবে তা ব্যবহার করা হয়েছে, বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভিডিও দেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি সম্পর্কে পুলিশ অবগত হয়েছে। যে পার্কে ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে, সেখানকার ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ পাঠানো হয়েছে। পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঘটনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের পর ভিডিওতে থাকা দুই তরুণকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
পুলিশের এই তৎপরতার মধ্যেই ভিডিওটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, ভিডিও নির্মাতার দাবি অনুযায়ী অস্ত্রগুলো খেলনা হলেও সাধারণ মানুষের কাছে সেগুলো আসল অস্ত্রের মতোই মনে হয়েছে। ফলে প্রকাশ্য স্থানে এমন আচরণ আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে এবং অনুকরণ করে অন্যরাও একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এমন ভিডিও বিনোদনের উদ্দেশ্যে তৈরি হলেও এর প্রভাব যে সবসময় বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটি সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। বিশেষ করে শিশু ও সাধারণ পথচারীদের সামনে অস্ত্রের মতো বস্তু তাক করে ভয় দেখানোর ঘটনা সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং জননিরাপত্তার বিষয়টিকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
এখন পুলিশের যাচাইয়ের পরই স্পষ্ট হবে ভিডিওতে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো প্রকৃতপক্ষে কী এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না। তবে খেলনা বন্দুকের দাবি সত্য হলেও প্রকাশ্য স্থানে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে এমন ভিডিও তৈরি করা কতটা নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য—সেই প্রশ্নের উত্তরও এখন সামনে এসেছে।



