প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
ব্রিটেনের রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারকে ঘিরে। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির হতাশাজনক ফলাফলের পর থেকেই দলের ভেতরে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। তবে সোমবার সেই অসন্তোষ প্রকাশ্য বিদ্রোহে রূপ নেয়, যখন একসঙ্গে চারজন সংসদীয় সচিব পদত্যাগ করেন এবং দলটির সত্তরের বেশি সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর সরে দাঁড়ানোর দাবি জানান।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনে ভরাডুবির পর কেয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন অনেক নেতা। লন্ডনে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া তার সাম্প্রতিক বক্তব্য পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে উল্টো ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। অনেক সংসদ সদস্যের অভিযোগ, জনগণের আস্থা ধরে রাখতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অবস্থানে আর নেই।
স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির ফলাফলকে দলের ইতিহাসের অন্যতম বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। নির্বাচনের পর থেকেই দলটির বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়। দলীয় নেতাদের একাংশ মনে করছেন, স্টারমারের অধীনে থাকলে আগামী সাধারণ নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে।
ব্রিটিশ রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে মন্ত্রিসভার ভেতরের অসন্তোষ। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীও এখন স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বলে জানা গেছে। স্বরাষ্ট্রবিষয়ক দায়িত্বে থাকা সাবানা মাহমুদসহ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী নাকি ব্যক্তিগতভাবে তাকে ক্ষমতা ছাড়ার সময়সীমা নির্ধারণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। একইসঙ্গে পররাষ্ট্রবিষয়ক দায়িত্বে থাকা ইভেট্টে কুপার শান্তিপূর্ণভাবে নেতৃত্ব হস্তান্তরের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড লামিও নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তৈরির কথা বলেছেন বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র দাবি করছে।
দলীয় নেতাদের এই অবস্থান ব্রিটিশ রাজনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। কারণ সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে এত বড় সংখ্যক নেতার প্রকাশ্য বিরোধিতা খুব কমই দেখা যায়। পদত্যাগকারী কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন আর সংসদ সদস্যদের বড় অংশের আস্থা স্টারমারের প্রতি অবশিষ্ট নেই। তারা মনে করছেন, দলের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দেশের জনগণের কাছেও নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।
তবে এত চাপের মধ্যেও নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন কেয়ার স্টারমার। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে দায়িত্ব ছাড়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই। লন্ডনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব পরিবর্তন ব্রিটেনের জন্য অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও দাবি করেন, জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকার দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে। তিনি নিজেকে আরও সক্রিয় ও দৃঢ় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতিও দেন। কিন্তু তার এই বক্তব্যেও দলীয় ক্ষোভ কমেনি। বরং অনেক তরুণ নেতা ও কনিষ্ঠ মন্ত্রী আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের দাবি তুলেছেন।
এদিকে সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে পদত্যাগ করা কর্মকর্তাদের জায়গায় নতুন মুখ আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, শুধু নতুন নিয়োগ দিয়ে এই সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হবে। কারণ সমস্যার মূল জায়গা এখন নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা।
স্টারমারের ঘনিষ্ঠরা অবশ্য সতর্ক করে বলছেন, বারবার নেতৃত্ব পরিবর্তন করলে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির মতো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, হঠাৎ নেতৃত্ব বদল সরকার পরিচালনায় অস্থিরতা তৈরি করবে এবং দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবুও বাস্তবতা হলো, বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা লেবার পার্টির ভেতরে এখন গভীর বিভক্তি তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসই ঠিক করে দেবে কেয়ার স্টারমার শেষ পর্যন্ত নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারবেন কি না। দলীয় বিদ্রোহ যদি আরও বাড়ে, তাহলে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের পথ খুলে যেতে পারে।



