প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ১০:১৩ এএম
দেশে চলমান গ্যাস সংকট সাময়িক বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হয়ে আসবে। সরবরাহ ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক বিঘ্ন কাটিয়ে উঠতে সরকার কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে ঢাকা-১৭ আসনের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও মন্দিরে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার এক অনুষ্ঠানে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি গ্যাস সংকটের কারণ, অবৈধভাবে গ্যাস উত্তোলন, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বিদেশ থেকে আমদানি করা গ্যাস সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য সাগরে দুটি জাহাজ রয়েছে। এগুলোর মালিকানা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে একটি জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটার পর সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানান তিনি। ওই দুর্ঘটনার প্রভাব সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ে এবং অপর জাহাজটির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। এর ফলে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে।
তবে পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে ইতোমধ্যে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষ্য, গত সপ্তাহ থেকেই সরবরাহ চালু হয়েছে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে সংকট আরও কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অবৈধ গ্যাস উত্তোলন বন্ধে সামাজিক প্রতিরোধের আহ্বান
গ্যাস সংকটের পাশাপাশি পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস নেওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তার অভিযোগ, একটি অসাধু চক্র বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে জোরপূর্বক পাইপলাইন থেকে গ্যাস সরিয়ে নিচ্ছে। এতে ওই চক্র আর্থিকভাবে লাভবান হলেও বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে শুধু সরকারি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি জনগণকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তার মতে, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের মতো জাতীয় সম্পদের অবৈধ ব্যবহার রোধে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। এসব সম্পদ জনগণের এবং সেগুলোর সুফলও জনগণের কাছে পৌঁছানো উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন ব্যক্তি বা একটি চক্র অবৈধভাবে সুবিধা নিলে তার প্রভাব পড়ে অনেক মানুষের ওপর। তাই জাতীয় সম্পদ রক্ষায় নাগরিকদের সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতেও জ্বালানি চাপে বাংলাদেশ
দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও যোগসূত্র রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশও জ্বালানি খাতে চাপের মুখে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার ভাষ্য, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন দেশে জ্বালানির মূল্য বাড়লেও বাংলাদেশে শুরুতে মূল্য সমন্বয়ের পরিবর্তে জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জ্বালানির অপব্যবহার ও বাজার পরিস্থিতির কারণে পরবর্তী সময়ে মূল্য বাড়ানোর প্রয়োজন হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি আহরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
১৩০টি কূপ অনুসন্ধানের উদ্যোগ
দেশে গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত থাকার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোথায় কী পরিমাণ গ্যাস রয়েছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান এখনো হয়নি। ফলে নতুন গ্যাসের সন্ধানে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশীয় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল করে রেখে দেশের জ্বালানি খাতকে বিদেশিনির্ভর করা হয়েছিল।
বর্তমান সরকার দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র খুঁজে বের করার ওপর জোর দিচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে ১৩০টি গ্যাসকূপ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব অনুসন্ধানে নতুন মজুতের সন্ধান মিললে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জনগণের সম্পদ জনগণের কল্যাণে
অনুষ্ঠানে সরকারের সামগ্রিক লক্ষ্য নিয়েও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও তৃণমূলের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো সরকারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ বিএনপিকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই দায়িত্ব সহজ নয়। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যার কারণে দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সময় প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকাশিত শ্বেতপত্রের তথ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের কথা উঠে এসেছে। তার দাবি, এসব অর্থ ও সম্পদ দেশের মানুষের। রাষ্ট্রীয় সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে সরকার।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যয় হওয়াই সরকারের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে অপচয়, দুর্নীতি ও অবৈধ লেনদেন বন্ধ করার পাশাপাশি পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
৪১ লাখ নারীর হাতে পরিবার কার্ড
নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
তিনি জানান, ঢাকা-১৭ আসনে পরিবার কার্ড বিতরণের কার্যক্রমের সূচনা করা হয়েছে। আগামী নভেম্বর অথবা ডিসেম্বর থেকে ৪১ লাখ নারীর হাতে এ কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রয়োজনীয় সহায়তার আওতাভুক্ত পরিবারগুলোকে নির্দিষ্ট সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষ্য, বর্তমান সরকার নারীদের স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী জনগোষ্ঠী গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও কৃষকদের সহায়তা
ধর্মের ভিত্তিতে কোনো ধরনের বৈষম্য করা হবে না বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। দেশের বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।
একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। কৃষকদের আর্থিক চাপ কমাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। কৃষি খাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও গতিশীল করার লক্ষ্য রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। তবে বড় কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন। তাই পর্যায়ক্রমে প্রতিটি অঙ্গীকার পূরণের দিকে সরকার এগোচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে দলের স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান বাড়ানোর ওপরই সরকারের গুরুত্ব রয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে।



