প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬, ১০:০০ এএম
দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গালাগালি ও পারস্পরিক শত্রুতা পরিহার করে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবেই, তবে ভিন্নমত কোনোভাবেই যেন ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। তার বক্তব্যের সময় সংসদ সদস্যদের অনেকে টেবিল চাপড়িয়ে সমর্থন জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণের ওপর কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী শাসন চাপিয়ে দেওয়া যেমন কাম্য নয়, তেমনি রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে গালাগালি ও অসৌজন্যমূলক আচরণে পরিণত করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
জনপরিসরে ব্যবহৃত ভাষা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার বক্তব্য, পারিবারিক পরিবেশে যেসব শব্দ ব্যবহার করতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না, সেসব শব্দ জনপরিসরেও ব্যবহার না করাই উচিত। সংসদ সদস্য ও দেশের সচেতন নাগরিকদের এ বিষয়ে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে গালাগালি ও বিদ্বেষের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সবাইকে সম্মিলিতভাবে অবস্থান নিতে হবে। একই সঙ্গে গণতন্ত্রপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি হলে তা দেশের জন্য ক্ষতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তার ভাষ্য, সরকারি দল ও বিরোধী দল—সব পক্ষের দায়িত্ব হলো দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলা। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই নীতির কথা তুলে ধরেন।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের কথাও বক্তব্যে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে এবং শহীদদের প্রতি দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিতে হবে। মতের ভিন্নতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হলেও তা যেন সংঘাত বা শত্রুতার রূপ না নেয়, সেটিই নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জাতীয় সংসদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে সংসদকে কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চান তারা। তৃতীয় অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা দেশের স্বার্থে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছেন উল্লেখ করে তিনি সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, সংসদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। জনগণের সমস্যা নিয়ে কার্যকর আলোচনা হবে, তাদের জীবনযাত্রার দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমবে এবং দেশে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হবে—এটাই মানুষের প্রত্যাশা।
সমাপনী বক্তব্যে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতের শাসনামলে অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ লুটপাট ও বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে দেশকে বড় ধরনের আর্থিক বোঝা বহন করতে হয়েছে। তার দাবি, ওই সময়ের রেখে যাওয়া ঋণের চাপ এখনো দেশের জনগণকে বহন করতে হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের ঋণ পরিস্থিতি উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগের সময়ে ঋণখেলাপির অনুপাত যেখানে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, তা বর্তমানে কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি এটিকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির একটি লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিদেশি ঋণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের ওপর থাকা ঋণের দায় পরিশোধে বর্তমান সরকারকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। গত পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এর আগে বিকেল ৩টায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। মাগরিবের নামাজের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশন সমাপ্তির বিষয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশ সংসদে পড়ে শোনান।
সংসদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সমাপনী দিনে প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। এরপর সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে সমাপনী বক্তব্য শুরু করেন।



