প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে দ্রুত সামরিক অগ্রগতির মাধ্যমে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনী। বিশেষ করে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ওই নৌপথে হুতিদের প্রভাব অনেকটাই বেড়েছে। এর ফলে লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক দিনের ধারাবাহিক সংঘর্ষের পর বৃহস্পতিবার মোখা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয় হুতি বাহিনী। শহরটি ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থিত এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি হওয়ায় সামরিক ও বাণিজ্যিক—দুই দিক থেকেই এর গুরুত্ব অনেক। হুতিদের অগ্রযাত্রার মুখে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সমর্থক বাহিনী ওই এলাকা থেকে সরে গিয়ে দক্ষিণ দিকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করে।
এরপর হুতি বাহিনী আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে ধুবাব এলাকায় পৌঁছে এবং বাব আল-মান্দেবের দিকে তাদের অবস্থান শক্ত করে। একই সময়ে প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন দ্বীপেও হুতি যোদ্ধারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দ্বীপটির অবস্থান বাব আল-মান্দেবের মাঝামাঝি অংশে হওয়ায় সেখান থেকে নৌপথ পর্যবেক্ষণ ও সামরিকভাবে চাপ তৈরির সুযোগ রয়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ। এটি একদিকে লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, অন্যদিকে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে এই এলাকার ওপর কোনো পক্ষের সামরিক নিয়ন্ত্রণ বাড়লে তার প্রভাব শুধু ইয়েমেন বা আশপাশের দেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
মোখা দখলের পর হুতিদের সামরিক সাফল্যকে ইয়েমেন সরকারের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ পশ্চিম উপকূলের এই শহরটি আগে সরকারি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মোখা হারানোর পর সরকারি বাহিনী ধুবাবসহ দক্ষিণের কিছু এলাকায় নিজেদের প্রতিরক্ষা অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে হারানো এলাকা পুনর্দখলের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে হুতিদের এই অগ্রযাত্রার পেছনে ইরানের সহায়তা ও পরামর্শ থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক সূত্রের দাবি, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দিকনির্দেশনা হুতিদের সাম্প্রতিক অভিযানে ভূমিকা রেখেছে। তবে ইরান সরাসরি হুতিদের সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ার ফলে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। অতীতে হুতি বাহিনীর হামলার কারণে বহু আন্তর্জাতিক জাহাজ এই পথ এড়িয়ে দীর্ঘতর বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করেছিল। নতুন করে সংঘাত বাড়লে জাহাজের নিরাপত্তা ব্যয়, পরিবহন সময় এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাব আল-মান্দেবের মতো সংকীর্ণ ও কৌশলগত নৌপথের ওপর সামরিক চাপ বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ইউরোপমুখী জাহাজ চলাচল এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়বে। ইতোমধ্যে হুতিদের অগ্রযাত্রার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে হুতি পক্ষ আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল বন্ধ করার কোনো ঘোষণা দেয়নি। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলাচল অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ নিয়ে তাদের নিষেধাজ্ঞার অবস্থান বহাল থাকার কথা জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে মোখা, ধুবাব ও মায়ুন দ্বীপে হুতিদের সাম্প্রতিক সাফল্য ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এর মাধ্যমে বাব আল-মান্দেবের ওপর তাদের সামরিক চাপ বাড়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনাও আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখন সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান চালিয়ে হারানো এলাকাগুলো পুনর্দখল করতে পারে কি না, তার ওপর পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে।



