রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

অস্ত্র তৈরিতে গোপনে এআই ব্যবহার করেছিল হুতিরা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬, ১০:৩২ পিএম

অস্ত্র তৈরিতে গোপনে এআই ব্যবহার করেছিল হুতিরা

ছবিঃ সংগৃহীত

গাইডেড রকেট, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে গোপনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী। এ কাজে তারা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের তৈরি ‘ক্লড’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার শনাক্ত ও প্রতিরোধ নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অ্যানথ্রপিক এ তথ্য তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে সরাসরি হুতি গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে উত্তর ইয়েমেনে সক্রিয় একটি ‘হুমকি সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী’র কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে। উত্তর ইয়েমেনের বড় একটি অংশ বর্তমানে ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ওই গোষ্ঠীটি হুতিদের বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীটি ‘ক্লড কোড’ ব্যবহার করে উড্ডয়নকারী যান নিয়ন্ত্রণ, স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং লক্ষ্যভেদী নির্দেশনা-সংক্রান্ত সফটওয়্যার তৈরির কাজ করেছে। তারা নিজেদের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রাখার পাশাপাশি কাজগুলোকে একাধিক আলাদা যোগাযোগ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সেশনে ভাগ করে পরিচালনা করেছিল।

অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গোষ্ঠীটি অন্তত তিনটি অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছিল। এর মধ্যে একটি ছিল উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও শেষ পর্যায়ের লক্ষ্যভেদী নির্দেশনা প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ গাইডেড রকেট। দ্বিতীয় কর্মসূচির আওতায় দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বহু-ধাপের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করা হয়। তৃতীয় প্রকল্পটির নাম ছিল ‘আর-২০০০ সেট’, যার মধ্যে একটি হাইপারসনিক গ্লাইড যান তৈরির প্রচেষ্টাও অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ত্র তৈরির বিভিন্ন ধাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাটিকে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে সফটওয়্যার লেখা, প্রযুক্তিগত গবেষণা, উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সমন্বয়, প্রকৌশলগত নকশা তৈরি এবং উড্ডয়ন সিমুলেশন পরিচালনার মতো কাজ ছিল। একই সময়ে একাধিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেশন চালিয়ে আলাদা আলাদা দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হতো। একটি সেশনে কোড লেখা হলে অন্য সেশনে গবেষণা এবং আরেকটিতে তৈরি কাজ পর্যালোচনা করা হতো।

অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গোষ্ঠীটির অনেক অনুরোধ আটকে দেয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে তারা বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজে পায়। নিজেদের কর্মকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রাখতে তারা কাজের তথ্য বিভিন্ন সেশনে ছড়িয়ে রাখে, যাতে কোনো একটি কথোপকথন বিশ্লেষণ করে পুরো অস্ত্র প্রকল্পের ধারণা পাওয়া কঠিন হয়।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, গোষ্ঠীটি ইয়েমেনে একটি গাইডেড রকেটের সরাসরি পরীক্ষা চালিয়েছিল। তবে পরীক্ষাটি সফল হয়নি বলেই ধারণা করা হচ্ছে। পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কী ধরনের ত্রুটি হয়েছিল, তা শনাক্ত করতে তারা আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেয়।

তবে অ্যানথ্রপিক বলেছে, গোষ্ঠীটি কোনো কার্যকর অস্ত্র সফলভাবে মোতায়েন করতে পেরেছিল—এমন প্রমাণ তাদের হাতে নেই। কিন্তু রকেট প্রকল্পের বাইরেও দীর্ঘ সময় ধরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সিমুলেশন, গতিপথ নির্ধারণ এবং উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উন্নত করার কাজ চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া গোষ্ঠীটি এমন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সিমুলেশন সরঞ্জাম তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ছাড়াও পরিচালনা করা সম্ভব ছিল। অ্যানথ্রপিকের মতে, এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বাধীনভাবে প্রকৌশলগত কাজ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়।

ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলো বন্ধ করে দেয় অ্যানথ্রপিক। একই সঙ্গে গোষ্ঠীটির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের অবহিত করে প্রতিষ্ঠানটি।

অ্যানথ্রপিকের মতে, এই ঘটনা দেখিয়েছে—ব্যবহারকারীরা যখন নিজেদের উদ্দেশ্য গোপন করে এবং একটি জটিল প্রকল্পের কাজ বিভিন্ন যোগাযোগে ভাগ করে পরিচালনা করে, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা কতটা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে অস্ত্র তৈরির গবেষণা ও প্রকৌশলগত কাজ আরও দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার আশঙ্কাও এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে।

এমন সময়ে এই তথ্য প্রকাশ পেল, যখন ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা এবং এর জবাবে পাল্টা সামরিক অভিযানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে হুতিদের সংঘাতও চলমান রয়েছে।
 

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!