রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ধাক্কা, কমছে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: মে ১১, ২০২৬, ০৮:৪০ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ধাক্কা, কমছে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আবারও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পারস্পরিক শুল্কনীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া এবং উচ্চ সুদের চাপ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাক খাত কঠিন সময় পার করছে।

পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। শুধু রপ্তানির পরিমাণই নয়, বাংলাদেশি পোশাকের দামও কমে গেছে। এতে করে শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে বিভ্রান্তি, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব ফেলছে। এর সরাসরি চাপ পড়ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় আট শতাংশ কমেছে। একইভাবে বছরের প্রথম তিন মাসেও রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। শুধু তাই নয়, প্রতি পোশাকের গড় মূল্যও কমেছে কয়েক শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা আগের তুলনায় কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। ভিয়েতনাম তাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। একই সময়ে কম্বোডিয়ার রপ্তানিতেও শক্তিশালী অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে চীনের রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের বাজার সংকোচনের ফলে কিছু সুযোগ তৈরি হলেও বাংলাদেশ সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বড় আকারের অর্ডারের পরিবর্তে ছোট ও স্বল্পমেয়াদি অর্ডারে বেশি ঝুঁকছেন। এতে উৎপাদন পরিকল্পনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানাই লাভ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু কম খরচে পোশাক উৎপাদন করে আর দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক এবং বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনের দিকে নজর দেওয়া। একই সঙ্গে দক্ষ জনবল তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

ব্যবসায়ীরা আরও বলছেন, দেশের পোশাক শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি শিল্প উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বন্দর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পণ্য খালাসের সময় কমানো এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে আনার দাবিও উঠেছে।

এদিকে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, সেটিকে স্থায়ী ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ গত বছরের একই সময়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে রপ্তানি অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়েছিল। ফলে এবার তুলনামূলক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও সামগ্রিক চিত্র এখনো উদ্বেগজনক।

পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় অংশ আসে এই খাত থেকে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু শিল্প খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে রপ্তানি আয় আরও চাপের মুখে পড়তে পারে। তাই এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার বিকল্প নেই।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!