রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কনটেইনারে পণ্য নেই, কাগজে রপ্তানি সাড়ে ৫ কোটি টাকার

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম

কনটেইনারে পণ্য নেই, কাগজে রপ্তানি সাড়ে ৫ কোটি টাকার

ছবি: সংগৃহীত

কনটেইনারে বাস্তবে কোনো পণ্য না থাকলেও কাগজপত্রে বিপুল পরিমাণ পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে—এমন সন্দেহজনক পাঁচটি চালান আটক করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এসব চালানে প্রায় ১২১ টন পণ্য রপ্তানি দেখানো হয়েছে, যার ঘোষিত মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। তবে অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কনটেইনার ডিপোতে ঘোষিত পণ্যের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।

ঘটনার সূত্রপাত হয় রপ্তানি-সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের সময়। গত ৩ সেপ্টেম্বর একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি চালান গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নজরে আসে। প্রাথমিকভাবে চালানগুলোর গন্তব্য, পণ্যের ধরন এবং ঘোষিত ওজনসহ বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে বেশ কিছু অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে। এরপর সন্দেহজনক চালানগুলো আটকে সেগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত যাচাই শুরু করা হয়।

দাখিল করা রপ্তানি বিলের তথ্য অনুযায়ী, চালানগুলো একটি অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোর মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর কথা ছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করতে কাস্টমস গোয়েন্দার কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ডিপোতে সরেজমিন পরিদর্শন করেন। সেখানে রপ্তানির জন্য ঘোষিত পণ্য দেখানোর জন্য ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট পরিবহনকারীদের কাছে তথ্য চাওয়া হয়।

তবে পরিদর্শনের সময় ঘোষিত পণ্যের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ডিপো কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট চালানগুলোর পণ্য সেখানে প্রবেশ করেনি। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, পণ্য ডিপোতে না ঢুকেই কীভাবে রপ্তানি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি চালানে মোট ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৩০৪ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ কাগজপত্রে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানি দেখানো হলেও বাস্তবে সংশ্লিষ্ট পণ্য কোথায় রয়েছে, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

শুধু চালানের পণ্যের অস্তিত্ব নিয়েই নয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আগের আমদানি ও রপ্তানি তথ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি গত এক বছরে যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করেছে, তার তুলনায় ঘোষিত রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি। উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কাঁচামালের সঙ্গে প্রস্তুত পণ্যের একটি যৌক্তিক সামঞ্জস্য থাকার কথা থাকলেও প্রাথমিকভাবে সেই হিসাবের মধ্যে অসংগতি পাওয়া গেছে।

এ কারণে কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। পণ্য বাস্তবে না থাকলেও কাগজপত্রে রপ্তানি দেখানোর কোনো চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, পণ্য পরিবহন ও খালাসের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান, কনটেইনার ডিপো কর্তৃপক্ষ এবং কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, পণ্য ডিপোতে প্রবেশ না করলে সাধারণ নিয়মে সংশ্লিষ্ট চালানের পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা নয়। তাই ঘোষিত পণ্য কোথায় ছিল, কোন পর্যায়ে কীভাবে চালানগুলোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং এর পেছনে কারও যোগসাজশ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তদন্ত শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, রপ্তানি বিল, আমদানি-রপ্তানির হিসাব এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা বের করার চেষ্টা চলছে। তদন্তে কোনো অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত কাস্টমস আইনসহ প্রযোজ্য অন্যান্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

পণ্য ছাড়াই বিপুল অর্থের রপ্তানি দেখানোর অভিযোগটি তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে রপ্তানি ব্যবস্থাপনা, শুল্ক প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকার বিষয়ও জড়িয়ে আছে। তদন্ত শেষ হলে এ ঘটনায় প্রকৃত দায় কার এবং কীভাবে এত বড় অঙ্কের রপ্তানি কাগজপত্রে দেখানো হলো, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!