প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম
দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা ১৯ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত হিসাবের ভিত্তিতে এ তথ্য জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রোববার সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন।
সংসদ সদস্যের প্রশ্ন ছিল, বর্তমানে দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ কত এবং এ ঋণের চাপ কমাতে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। জবাবে অর্থমন্ত্রী নির্দিষ্ট হিসাব তুলে ধরে জানান, মার্চের শেষ দিন পর্যন্ত দেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা ১৯ পয়সা। অর্থাৎ দেশের মোট ঋণের পরিমাণকে জনসংখ্যার হিসাবে ভাগ করলে একজন নাগরিকের বিপরীতে গড়ে এই পরিমাণ ঋণ দাঁড়ায়।
তবে মাথাপিছু ঋণের এই হিসাবকে সরাসরি প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত ঋণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত রাষ্ট্রের মোট ঋণকে দেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে ভাগ করে পাওয়া একটি গড় হিসাব। ফলে একজন নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে ওই পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে—এমন অর্থ এ হিসাবের মধ্যে নেই। রাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধের দায় মূলত সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপরই থাকে।
ঋণের চাপ সামাল দিতে সরকারের পরিকল্পনার কথাও সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, সরকারি অর্থের সঠিক ও কার্যকর ব্যবহার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও শৃঙ্খলিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের আয় বাড়ানো এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে ঋণের ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংসদে এদিন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বিষয়েও তথ্য দেওয়া হয়। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত এসব ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ হাজার টাকা।
অন্যদিকে অগ্রণী ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৯ হাজার ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে রয়েছে ৮ হাজার ৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং বেসিক ব্যাংকে ৮ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৯ হাজার ২৮১ কোটি ৭৪ হাজার টাকা এবং সোনালী ব্যাংকে ১৫ হাজার ৪৮ কোটি ৩৯ হাজার টাকা বলে সংসদে জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর বিপুল খেলাপি ঋণ এবং দেশের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ—দুই তথ্যই দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারের গুরুত্ব সামনে এনেছে। একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ নিজে কোনো অর্থনীতির জন্য সবসময় নেতিবাচক নয়। উন্নয়নমূলক ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণের অর্থ যথাযথভাবে বিনিয়োগ করা হলে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আয় বৃদ্ধির তুলনায় ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়লে ভবিষ্যতে সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকলে ব্যাংকিং খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এ অবস্থায় রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, সরকারি অর্থের অপচয় রোধ, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং ঋণের অর্থ কার্যকর খাতে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে আর্থিক চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।



