রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণ শোধ ২৫ হাজার কোটি টাকা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬, ১১:২৩ এএম

পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণ শোধ ২৫ হাজার কোটি টাকা

ফাইল ছবি

বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই—এই পাঁচ মাসে সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। যেকোনো পাঁচ মাসের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে এই পরিমাণকে সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের বিদেশি ঋণ ব্যবস্থাপনার হালনাগাদ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের একই সময়ে পরিশোধ করা অর্থ আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে পরিশোধ করা হয়েছিল ১৮৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পাঁচ মাসে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১৫ কোটি ৪ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।

চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পরিশোধ করা মোট অর্থের মধ্যে ঋণের আসল বাবদ দেওয়া হয়েছে ১৩৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার। আর সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৬৯ কোটি ৫২ লাখ ডলার। অর্থাৎ পাঁচ মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪১ কোটি ডলার করে বিদেশি ঋণের দায় মেটাতে হয়েছে সরকারকে।

দেশের অর্থনীতিতে বিদেশি ঋণ পরিশোধের এই বাড়তি চাপের পেছনে আগের বছরগুলোতে নেওয়া বড় আকারের বিভিন্ন প্রকল্পের ঋণকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে নেওয়া এসব ঋণের অনেকগুলোর অবকাশকাল শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। ফলে নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে।

বিশেষ করে গত এক দশকের বেশি সময়ে বাস্তবায়িত বিভিন্ন বড় প্রকল্পে বিদেশি অর্থায়নের পরিমাণ বেড়েছিল। এসব ঋণ নেওয়ার সময় অনেক প্রকল্পে কয়েক বছর পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধের সুযোগ ছিল না। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর একসঙ্গে আসল ও সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে সরকারের বার্ষিক বাজেটে বিদেশি ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও ক্রমে বাড়ছে।

হালনাগাদ পরিসংখ্যানেও গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক চিত্রটি স্পষ্ট। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছিল ২৬৭ কোটি ডলার। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩৭ কোটি ডলারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিশোধের পরিমাণ আরও বেড়ে হয় ৪০৯ কোটি ডলার। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৪৪৯ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধের সময়সূচি এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কোনো প্রকল্প থেকে পর্যাপ্ত আয় বা উৎপাদনশীলতা তৈরি হওয়ার আগেই বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হলে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ পড়ে।

সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, আগের সময়ে নেওয়া অনেক ঋণের দায় এখন বর্তমান সরকারের সামনে এসেছে। বড় অবকাঠামো ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে নেওয়া ঋণের অবকাশকাল শেষ হওয়ায় নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতসহ কয়েকটি খাতে দীর্ঘদিনের আর্থিক দায়ও সরকারের ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে।

বর্তমান সরকার ভবিষ্যতে বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সতর্ক থাকার কথা বলছে। নতুন কোনো প্রকল্পে ঋণ নেওয়ার আগে সেই প্রকল্প থেকে কী ধরনের অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে, কতটা উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং কত মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে—এসব বিষয় বিবেচনায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি ঋণ নিজে অর্থনীতির জন্য সবসময় নেতিবাচক নয়। উৎপাদনশীল অবকাঠামো, শিল্প, যোগাযোগ বা এমন কোনো খাতে ঋণ ব্যবহার করা হলে তা ভবিষ্যতে আয় ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে। তবে প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে কিংবা প্রত্যাশিত সুফল না এলে সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধের ভার শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপরই পড়ে।

পাঁচ মাসে ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার পরিশোধের ঘটনা তাই দেশের অর্থনীতিতে বিদেশি ঋণের ক্রমবর্ধমান দায়ের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। একদিকে আগের নেওয়া ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে নতুন অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ করে আগামী বছরগুলোতে আরও কয়েকটি বড় প্রকল্পের ঋণের অবকাশকাল শেষ হলে পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু বর্তমান দায় পরিশোধ নয়, ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রকল্প নির্বাচন, ঋণের শর্ত এবং অর্থ ব্যবহারের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ প্রায় ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা পরিশোধের তথ্য দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় একটি বাস্তবতা তুলে ধরেছে। আগের সময়ে নেওয়া ঋণের দায় এখন পরিশোধের পর্যায়ে আসায় সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কতটা সতর্কতা অবলম্বন করা হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা।

 

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!