প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম
রাজধানীতে বাড়ছে হাম-রুবেলার ঝুঁকি। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে এবার প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত উদ্যোগে নামছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)।
মোবাইল এসএমএস, পুশ নোটিফিকেশন, ঘরে ঘরে প্রচারণা, মাঠপর্যায়ের ক্যাম্পেইন এবং অংশীজনদের সমন্বয়ে রাজধানীতে গড়ে তোলা হচ্ছে এক বিস্তৃত টিকাসুরক্ষা বলয়।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন,
“কোনো শিশুই যেন টিকার বাইরে না থাকে—এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
এজন্য শুধু টিকাকেন্দ্র নয়, অভিভাবকদের হাতের মোবাইলেও পৌঁছে যাবে টিকার তথ্য ও সতর্কবার্তা।”
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর ডিএনসিসি মিলনায়তনে আয়োজিত “বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অংশীজনদের সমন্বিত কার্যক্রমের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় এবং ২০২৬ সালের হামের প্রকোপ মোকাবেলা”
শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সভায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন।
রাজধানীতে নতুন স্বাস্থ্যসুরক্ষা কৌশল:
ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, নগর এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিভাবকদের সচেতনতার ঘাটতি, ভাসমান জনগোষ্ঠী এবং তথ্য বিভ্রান্তি।
এ কারণে এবার প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নাগরিকদের কাছে সরাসরি টিকার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান-
শিশুদের টিকার নির্ধারিত তারিখ স্মরণ করিয়ে দিতে মোবাইল এসএমএস পাঠানো হবে
অ্যাপ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পুশ নোটিফিকেশন দেওয়া হবে
স্থানীয় কাউন্সিলর, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে বাসা-বাড়িতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হবে
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালিত হবে
তার ভাষায়,
“স্বাস্থ্যসেবা শুধু হাসপাতালের দায়িত্ব নয়; এটি স্থানীয় সরকার, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।”
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে হামের ভয়াবহ বিস্তার:
সভায় তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ৬ মে ২০২৬ পর্যন্ত দেশে—
৪৪ হাজার ২৬০ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে
৬ হাজার ৯৯ জনের শরীরে ল্যাব পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে
২৬৮ জন সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলাতেই হাম সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতিকে “জাতীয় পর্যায়ে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্তদের বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। অপুষ্টি, সময়মতো টিকা না পাওয়া এবং জনবহুল নগর পরিবেশে বসবাসের কারণে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ঢাকা উত্তরে টিকাকভারেজে আশানুরূপ সফলতা অর্জন করেছে :
ইপিআই কাভারেজ ইভালুয়েশন সার্ভে ২০২৩ এর তুলনায়, ২০২৬ এ দেশের নগর এলাকায় পূর্ণাঙ্গ টিকাদান কভারেজে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকা সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ।
যদিও এটি ২০১৯ সালের তুলনায় ১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি, তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা জরুরি।
অন্যথায় সহজেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সভায় বক্তারা বলেন, রাজধানীর বস্তি এলাকা, ভাসমান জনগোষ্ঠী, নিম্নআয়ের পরিবার এবং কর্মজীবী অভিভাবকদের সন্তানদের মধ্যে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ফলে নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও তথ্যভিত্তিক করার তাগিদ দেন তারা।
জরুরি এমআর ক্যাম্পেইন চলমান:
হাম-রুবেলা পরিস্থিতি মোকাবেলায় গত ৫ এপ্রিল থেকে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য জরুরি এমআর (মিজেলস-রুবেলা) টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। ২০ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকাতেও এ কার্যক্রম জোরদার করা হয়।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার, ওয়ার্ডভিত্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও অস্থায়ী ক্যাম্পে শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।
অভিভাবকদের সন্তানদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বে প্রশংসিত:
সভায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগে দেশে পোলিও ও ধনুষ্টঙ্কার নির্মূল হয়েছে। এছাড়া হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে।
বর্তমানে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় ৯টি অ্যান্টিজেনের মাধ্যমে ১২টি রোগের বিরুদ্ধে টিকা দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে—
এইচপিভি টিকায় ৯৩ শতাংশ কভারেজ
টিসিভি টিকায় ৯৭ শতাংশ কভারেজ অর্জিত হয়েছে
ইউনিসেফের প্রতিনিধি মালাইলা ইউসুফজাই বলেন,
“বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর কাছে নিরাপদ টিকা পৌঁছে দিতে ইউনিসেফ সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।”
সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ঝুঁকি কমবে না:
অনুষ্ঠানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম, ইউনিসেফের ইমিউনাইজেশন ম্যানেজার ড. রিয়াদ মাহমুদ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ড. নিজাম উদ্দীন আহমেদ টিকাদান কার্যক্রমে সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য, নগর জীবনের ব্যস্ততা এবং সচেতনতার অভাব টিকাদান কর্মসূচির বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এজন্য স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং উন্নয়ন সহযোগীদের একযোগে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী। সঞ্চালনা করেন ডা. মাহমুদা আলী।
শিশু সুরক্ষায় এখনই জরুরি পদক্ষেপ:
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম শুধু একটি সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ নয়; এটি নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, অন্ধত্ব এবং মৃত্যুর মতো জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই সময়মতো টিকা নিশ্চিত করাই শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা—
“একটি টিকাবঞ্চিত শিশু শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”
রাজধানীতে যখন হাম প্রতিরোধে নতুন লড়াই শুরু হয়েছে, তখন প্রযুক্তি, সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগের এই অভিযানে
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—
‘সব শিশুর কাছে কি সত্যিই পৌঁছাবে জীবনরক্ষাকারী টিকা?’



