প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ০২:০৩ পিএম
টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘদিনের ঘাটতি ও নিয়মিত কার্যক্রমে ব্যাঘাতের কারণে বাংলাদেশে হাম ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ হাম-সংশ্লিষ্ট উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যতথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে হাম সংক্রমণের বিস্তার বিশ্বে অন্যতম গুরুতর অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়েছে। প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে আক্রান্তদের বড় একটি অংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। টিকার সুরক্ষা থেকে বাদ পড়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, হাম প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে এক লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে অনেকের অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে হাম থেকে নিউমোনিয়া, অপুষ্টি ও অন্যান্য জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতার প্রভাব নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতেও পড়ে। এর পাশাপাশি টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় তদারকির ঘাটতির কারণে অনেক এলাকায় সময়মতো টিকা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়া শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন সংসদে জানিয়েছেন, টিকা সংগ্রহের নীতিতে পরিবর্তনের কারণে এক পর্যায়ে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালে একটি নির্ধারিত টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরের বছর দেশব্যাপী হাম ও রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু টিকাদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্নকে বাংলাদেশে হাম সংক্রমণ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে টিকাদানের মাধ্যমে হাম নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছিল, সাম্প্রতিক ঘাটতির কারণে তা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি ভিত্তিতে টিকা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, তাদের শনাক্ত করে দ্রুত টিকার আওতায় আনার পাশাপাশি প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ কার্যক্রম চালানোর প্রয়োজন রয়েছে।
তাদের মতে, টিকা সরবরাহে যেন ভবিষ্যতে কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য আগাম পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত মজুত, কার্যকর তদারকি এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যেও টিকাদানের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি সংক্রামক রোগ হলেও পর্যাপ্ত টিকাদান না থাকলে দ্রুত বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই চলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকার ঘাটতি পূরণ, নিয়মিত টিকাদানের আওতা বৃদ্ধি এবং বাদ পড়া সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।



