রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে দেশের প্রথম সফল রোবটিক সার্জারি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম

ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে দেশের প্রথম সফল রোবটিক সার্জারি

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় নতুন প্রযুক্তির সংযোজন হিসেবে বিশেষায়িত রোবটের সহায়তায় সফলভাবে দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। রাজধানীর মাদানী অ্যাভিনিউয়ে ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে সোমবার (৩১ আগস্ট) অত্যাধুনিক ‘মেডবট তুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট’-এর মাধ্যমে একই দিনে দুই রোগীর অস্ত্রোপচার করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এর মধ্য দিয়ে দেশে নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গ রোবোটিক অস্ত্রোপচারের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।

প্রথম অস্ত্রোপচারটি করা হয় পিত্তথলিতে পাথরে আক্রান্ত ৫৭ বছর বয়সী এক পুরুষ রোগীর। অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীনের নেতৃত্বে চিকিৎসক দল রোবটের সহায়তায় পিত্তথলি অপসারণের অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন করেন। পরে অস্বাভাবিক জরায়ু রক্তক্ষরণে আক্রান্ত ৪৫ বছর বয়সী এক নারীর জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার করেন অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলী। দুটি অস্ত্রোপচারেই বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত চিকিৎসক দল অংশ নেয়।

চিকিৎসকেরা জানান, রোবোটিক অস্ত্রোপচারে চিকিৎসকরা শরীরের ভেতরের অংশ ত্রিমাত্রিক ও উচ্চমাত্রার স্পষ্টতায় দেখতে পারেন। একই সঙ্গে রোবোটিক বাহুগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নড়াচড়া করতে পারে এবং সংকীর্ণ ও জটিল স্থানে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি করে। এর ফলে অস্ত্রোপচারের সময় সূক্ষ্মতা বাড়ানো, আশপাশের টিস্যুর ক্ষতি কমানো এবং রক্তক্ষরণ কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। অস্ত্রোপচারের পর রোগীর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি সহায়ক হতে পারে।

অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন বলেন, রোবোটিক অস্ত্রোপচার আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। মানুষের হাতের স্বাভাবিক নড়াচড়ার সীমাবদ্ধতার তুলনায় রোবোটিক বাহুর বিশেষ ধরনের নড়াচড়া চিকিৎসকদের জটিল ও সংকীর্ণ স্থানে আরও নিখুঁতভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও আশপাশের অঙ্গ সুরক্ষিত রেখে তুলনামূলক কম কাটাছেঁড়ায় অস্ত্রোপচার করার সুযোগ তৈরি হয়।

অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলী জানান, রোবোটিক অস্ত্রোপচারের এই কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। হৃদ্‌যন্ত্রের অস্ত্রোপচার, স্নায়ু অস্ত্রোপচার, মূত্রনালির চিকিৎসা, সাধারণ অস্ত্রোপচার, স্ত্রীরোগ ও বক্ষগহ্বরের অস্ত্রোপচারের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর অনেক বাংলাদেশি রোগী বিদেশে যান। দেশে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো গেলে এসব রোগীর একটি বড় অংশকে দেশেই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। এতে রোগীদের বিদেশে যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমার পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে দেশে রোবোটিক অস্ত্রোপচার একেবারে নতুন হলেও রোবট-সহায়ক চিকিৎসার নজির এর আগে রয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রোবটের সহায়তায় স্টেন্ট স্থাপনের একটি চিকিৎসা কার্যক্রম হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সেটি ছিল নির্দিষ্ট হৃদ্‌রোগের চিকিৎসায় রোবটের সহায়তা নেওয়া একটি প্রক্রিয়া; অন্যদিকে ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে ব্যবহৃত যন্ত্রটি পূর্ণাঙ্গ অস্ত্রোপচারের জন্য বিশেষায়িত রোবট এবং নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চালুর লক্ষ্যেই এটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের পর ইউনাইটেড হেলথকেয়ারসহ দুটি বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানকে রোবোটিক অস্ত্রোপচারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশে এ ধরনের চিকিৎসা নিয়মিতভাবে সম্প্রসারণের পথ আরও সুগম হয়েছে।

চিকিৎসা খাতে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, দক্ষ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য বিদেশমুখিতা আরও কমানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসার সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রোবোটিক অস্ত্রোপচারের এই সূচনা তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!