প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসেনি শিশুটি। জন্মের পরপরই তাকে ফেলে যাওয়া হয়েছিল নির্জন স্থানে। জীবনের শুরুতেই নির্মম পরিত্যাগের শিকার হওয়া সেই নবজাতক শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেছে মানুষের মানবিকতায়। বর্তমানে চিকিৎসা শেষে নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে বরগুনার বামনায় উদ্ধার হওয়া সেই কন্যাশিশু।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৪ আগস্ট বিকেলে বরগুনার বামনা উপজেলার সোনাখালী গ্রামে। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ইউনিটের সামনে একটি দোকানের পেছনে নারকেলগাছের পাশে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে নবজাতকটিকে ফেলে রাখা হয়েছিল। সেখানে পড়ে থাকা শিশুটির কান্নার শব্দ শুনতে পান স্থানীয় কয়েকজন। পরে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন।
উদ্ধারের সময় শিশুটির বয়স ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তার নাড়ি তখনো নাভির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শরীরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য পিঁপড়া লেগে ছিল। এত অল্প বয়সে এমন নির্মম পরিস্থিতির মধ্যে পড়লেও কান্নার শব্দই শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনে।
উদ্ধারের পর দ্রুত শিশুটিকে বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তার নাড়ি কেটে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শিশুটির মাথা, বুক ও মুখে ক্ষতচিহ্ন পাওয়া যায়। পাশাপাশি তার চোখেও সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে তিন দিন বয়সী শিশুটিকে আগৈলঝাড়া ছোটমনি নিবাসে নেওয়া হয়।
পরে শিশুটির শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দিলে তাকে ঢাকায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ২৬ আগস্ট শিশুটিকে মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসায় ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঘটে।
চিকিৎসা শেষে বর্তমানে শিশুটিকে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় অবস্থিত ডা. মুজিব নওয়াব ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. মজিবুর রহমান মুজিব জানিয়েছেন, শিশুটির বর্তমান শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। নতুন কোনো জটিলতাও দেখা দেয়নি। সেখানে ছয় মাস তাকে পরিচর্যা করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে উপযুক্ত ও সচ্ছল পরিবারের কাছে শিশুটিকে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিত্যক্ত নবজাতকদের জন্য কাজ করা প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখন পর্যন্ত ৭৭ জন পরিত্যক্ত নবজাতককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৫ জন ইতোমধ্যে নতুন পরিচয় পেয়েছে এবং বিভিন্ন সচ্ছল পরিবারে বেড়ে উঠছে।
বামনার এই নবজাতকও এখন সেই নতুন জীবনের অপেক্ষায়। যে শিশুটির পৃথিবীতে আসার পর প্রথম পরিচয় ছিল পরিত্যক্ত, মানুষের ভালোবাসা ও যত্নে তার সেই পরিচয় বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বড় আশার কথা। জন্মের পর যে কান্না তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিল, সেই কান্নাই হয়তো একদিন পরিণত হবে নিরাপদ ও সুন্দর জীবনের গল্পে।



