প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ১০:২৩ পিএম
বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় যুক্ত হলো অত্যাধুনিক রোবটিক অস্ত্রোপচার প্রযুক্তি। রাজধানীর মাদানী এভিনিউয়ের ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে সোমবার একদিনে দুই রোগীর সফল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
প্রথম অস্ত্রোপচারটি করা হয় ৫৭ বছর বয়সী এক পুরুষ রোগীর পিত্তথলিতে জমে থাকা পাথর অপসারণে। একই দিনে ৪৫ বছর বয়সী এক নারী রোগীর অতিরিক্ত জরায়ু রক্তক্ষরণজনিত সমস্যার চিকিৎসায় জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচারও রোবটিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। দুটি অস্ত্রোপচারই সফল হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অস্ত্রোপচার দুটি পরিচালনা করেন অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন ও অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান। চিকিৎসকেরা জানান, রোবটিক অস্ত্রোপচারে চিকিৎসক নিজে সরাসরি রোবটের হাতে অস্ত্রোপচার করান না। বরং বিশেষ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে চিকিৎসক রোবটের প্রতিটি নড়াচড়া অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিচালনা করেন।
এই প্রযুক্তির অন্যতম সুবিধা হলো শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ত্রিমাত্রিক ও বড় আকারে স্পষ্টভাবে দেখার সুযোগ। পাশাপাশি রোবটিক বাহু বিভিন্ন দিকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নড়াচড়া করতে পারে। ফলে শরীরের এমন সংকীর্ণ ও জটিল জায়গায়ও অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়, যেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে চিকিৎসকের হাতের নড়াচড়া সীমিত থাকে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, রোবটিক অস্ত্রোপচারে সাধারণত বড় ধরনের কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন কমে আসে। এর ফলে রক্তক্ষরণ ও আশপাশের টিস্যুর ক্ষতি তুলনামূলক কম হতে পারে। অস্ত্রোপচারের পর ব্যথা কম হওয়া এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনাও এই প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন বলেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোবটিক অস্ত্রোপচার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। বিশেষ করে শরীরের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল অংশে চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হওয়ায় অস্ত্রোপচারের নির্ভুলতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও আশপাশের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি কমানোর সুযোগও তৈরি হয়।
অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান জানান, ভবিষ্যতে হৃদরোগ, মস্তিষ্ক, মূত্রনালি, সাধারণ অস্ত্রোপচার, স্ত্রীরোগ এবং বক্ষদেশের বিভিন্ন অস্ত্রোপচারেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদেশে গিয়ে যে ধরনের উন্নত অস্ত্রোপচার করাতে হয়, তার একটি বড় অংশ দেশে দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য।
তবে নতুন এই প্রযুক্তির যাত্রার সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও সহায়ক জনবল এবং অস্ত্রোপচারের সামগ্রিক ব্যয়—সবকিছু মিলিয়ে রোবটিক চিকিৎসা সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। ফলে প্রযুক্তি চালুর পাশাপাশি রোগীর সামর্থ্যের মধ্যে চিকিৎসার ব্যয় রাখা এবং নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে রোবটিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। এতে রোগীদের সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের চাপও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এর আগে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে রোবট-নিয়ন্ত্রিত বিশেষ হৃদরোগ চিকিৎসা-প্রক্রিয়ায় যন্ত্র বসানোর কার্যক্রম হয়েছিল। তবে সেটি বর্তমান রোবটিক অস্ত্রোপচারের সঙ্গে এক নয় এবং নিয়মিত সেবা হিসেবে চালু হয়নি। ফলে এবার পিত্তথলি ও জরায়ুর অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে দেশে রোবটিক অস্ত্রোপচারের নিয়মিত ব্যবহারের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।



