প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬, ০১:২৪ পিএম
লাখো মানুষের ঘরমুখো যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সমন্বিত উদ্যোগে ব্যস্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শ্রমিক ও স্বেচ্ছাসেবকরা, পবিত্র ঈদুল আযহা সামনে রেখে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এখন ঘরমুখো মানুষের ঢল। দক্ষিণাঞ্চলের লাখো যাত্রীর নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত কার্যক্রমে এবারের ঈদযাত্রায় ভিন্নমাত্রার স্বস্তি ফিরেছে বলে মনে করছেন যাত্রীরা।
ঈদ উপলক্ষে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে মাঠে কাজ করছে র্যাব-১০ এর ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানি-১ (সিপিসি-১)। বর্তমানে ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এস এম হাসান সিদ্দিকী।
তিনি বলেন-
“ঈদকে কেন্দ্র করে সদরঘাটে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ তৈরি হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র্যাবের টহল জোরদার করা হয়েছে। টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি বৃদ্ধি, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি, ছিনতাই ও মলমপার্টি প্রতিরোধ, নারী ও শিশু নিরাপত্তা এবং যেকোনো নাশকতা মোকাবিলায় আমাদের সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যাত্রীদের নিরাপদে ঘরে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
র্যাব সূত্র জানায়, লঞ্চ টার্মিনাল ও আশপাশের এলাকায় সিসিটিভি মনিটরিং, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি, ভ্রাম্যমাণ টহল ও যাত্রী সচেতনতামূলক মাইকিং কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাড়তি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
অন্যদিকে যাত্রীসেবায় মানবিক উদ্যোগ হিসেবে এবার ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। যাত্রীদের মালামাল বহনে চালু করা হয়েছে “স্বেচ্ছাসেবক ফ্রি কুলি সার্ভিস”। এই কার্যক্রমের সার্বিক দায়িত্ব পালন করছেন সুমন ভূঁইয়া এর তত্ত্বাবধানে ঢাকা দক্ষিণ মহানগর শ্রমিক দল এর যুগ্ম আহ্বায়ক এবং জাতীয়তাবাদী ঘাট শ্রমিক দলের সিনিয়র সভাপতি ও নেতৃবৃন্দ।
এই কার্যক্রমে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন ঘাট শ্রমিক স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন। তারা যাত্রীদের ভারী ব্যাগ, মালামাল ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিনামূল্যে বহন করে লঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা এই সেবায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
স্বেচ্ছাসেবী শ্রমিকরা বলেন,
“ঈদ মানে আনন্দ, পরিবার আর ভালোবাসা। অনেক মানুষ কষ্ট করে মালামাল নিয়ে লঞ্চে ওঠেন। আমরা চাই মানুষ যেন নিরাপদে ও স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারে। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা এই কাজ করছি।”
এদিকে বৃদ্ধ, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের সহায়তায় মানবিক উদ্যোগ নিয়েছেন মেরিন প্রশিক্ষণার্থীরাও। তাদের পক্ষ থেকে টার্মিনালে রাখা হয়েছে হুইলচেয়ার সুবিধা। এই কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন সাজ্জাত সহ একদল প্রশিক্ষণার্থী।
তারা জানান, অনেক বয়স্ক মানুষ কিংবা শারীরিকভাবে অসুস্থ যাত্রী ভিড়ের মধ্যে চলাচলে সমস্যায় পড়েন। তাদের নিরাপদে লঞ্চে ওঠানামা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সদরঘাট ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। কেউ পরিবার নিয়ে ফিরছেন গ্রামের বাড়ি, কেউ আবার দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা শেষে ছুটছেন প্রিয়জনের কাছে। টার্মিনালজুড়ে বাড়তি চাপ থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা, স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তা এবং বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগের কারণে আগের তুলনায় অনেক বেশি শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে।
বরিশালগামী এক যাত্রী বলেন,
“আগে সদরঘাটে এলে ভয় লাগত। ছিনতাই, ভোগান্তি, বিশৃঙ্খলা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এবার র্যাবের উপস্থিতি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় অনেক স্বস্তি লাগছে।”
নৌপরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদযাত্রা শুধু পরিবহন ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, এটি মানুষের আবেগ, পরিবার ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি বড় মানবিক আয়োজন। আর সেই আয়োজন সফল করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শ্রমিক, স্বেচ্ছাসেবক ও বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা।
লাখো মানুষের নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে সদরঘাট যেন এখন শুধু একটি লঞ্চ টার্মিনাল নয়—এটি পরিণত হয়েছে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও সম্মিলিত উদ্যোগের এক অনন্য উদাহরণে।



