প্রকাশিত: জুলাই ৩, ২০২৬, ১১:৫২ পিএম
দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলকে ঘিরে আবারও রাজস্ব আদায়, শুল্ক ব্যবস্থাপনা এবং পণ্য খালাস প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে অনিয়ম, ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের অমিল, উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে ছাড় করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এবং পণ্য আত্মসাতের একাধিক ঘটনার পর সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। এ অবস্থায় বন্দরের কার্যক্রমে আরও কঠোর নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর তদারকির দাবি জোরালো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমসের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে মোট রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। একই সময়ে আমদানিকৃত পণ্যের পরিমাণও আগের বছরের তুলনায় কমেছে। উচ্চ শুল্কের বিভিন্ন পণ্যের আমদানি হ্রাসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতিও রাজস্ব আদায়ে প্রভাব ফেলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ, শুধু আমদানি কমে যাওয়াই নয়, দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র ওজন পরিবর্তন, মিথ্যা ঘোষণাপত্র এবং বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকির সুযোগ সৃষ্টি করছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে কম শুল্কের পণ্যের ঘোষণা দিয়ে বাস্তবে উচ্চ শুল্কের পণ্য খালাস করা হচ্ছে। এতে সরকার যেমন বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি বৈধ ব্যবসায়ীরাও প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এসব অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে বেকিং উপকরণের ঘোষণার আড়ালে বিপুল পরিমাণ উচ্চ শুল্কের শাড়ি ও পোশাক জাতীয় পণ্য উদ্ধার করা হয়। পরে তদন্ত শেষে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। একইভাবে শিক্ষাসামগ্রীর চালানের আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য আনার অভিযোগেও আরেকটি চালান জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া ফলবাহী একটি ট্রাকের ওজন নির্ধারণে অসঙ্গতির ঘটনাও আলোচনায় আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৃত ওজনের সঙ্গে নথিভুক্ত ওজনের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়। যদিও দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার দাবি, এটি যন্ত্রের কারিগরি ত্রুটির কারণেও হতে পারে। তবুও বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন মামলায় ইতোমধ্যে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। শুল্ক ফাঁকি, পণ্য পাচার এবং অনিয়মের ঘটনায় পৃথক মামলাও দায়ের হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে একই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা আরও বলেন, দেশের অন্যতম প্রধান রাজস্ব আহরণকারী এই বন্দরে ওজন নির্ধারণ ও পণ্য যাচাই ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় এনে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন রাজস্ব ফাঁকি কমবে, অন্যদিকে বাণিজ্য কার্যক্রমেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনিয়মের প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা ব্যবসায়ী—যেই হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, সরকারের রাজস্ব সুরক্ষায় কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। ওজন কারচুপি, মিথ্যা ঘোষণা কিংবা শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, কার্যকর নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বেনাপোল বন্দরের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে এবং রাজস্ব আদায়ও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হবে।



