প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ০৮:০৫ এএম
দেশজুড়ে টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, সিলেট, মৌলভীবাজারসহ দেশের কয়েকটি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বেশ কয়েকটি স্থানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোত ও টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের একাধিক উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক ঘরবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমি পানির নিচে চলে গেছে। বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়া মানুষকে উদ্ধারে কাজ চলছে। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলায় বিপুলসংখ্যক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভেসে গিয়ে তিন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রবল পানির স্রোতে পৃথক ঘটনায় ওই শিশুদের মৃত্যু হয়। এছাড়া কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন্যার পানিতে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ধসে কক্সবাজার জেলায় কয়েক দিনে প্রাণহানির সংখ্যাও বেড়েছে।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পানিবন্দি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকেও নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে উজানে বৃষ্টিপাত কমলে কিছু এলাকায় ধীরে ধীরে পানি কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নদীগুলোর মধ্যে হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরীসহ কয়েকটি নদীর পানি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কক্সবাজারেও বন্যার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা প্লাবিত হওয়ায় অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। কোথাও কোথাও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পানিতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ডুবে যাওয়ায় যান চলাচলেও সমস্যা দেখা দিয়েছে।
পার্বত্য অঞ্চলের বান্দরবান ও রাঙামাটিতেও দুর্যোগ পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক জায়গায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো সচল করার চেষ্টা চলছে।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি এলাকায় এখনো অনেক পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। কয়েকটি গ্রামে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়েছে। পর্যটন এলাকা থেকেও আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট ও মৌলভীবাজারেও বন্যার প্রভাব বাড়ছে। ভারি বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মৌলভীবাজারে নদীর বাঁধ ভেঙে কয়েকটি গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। হবিগঞ্জেও নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিও বাড়তে শুরু করেছে। নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা গেছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।



