প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
অবিরাম বর্ষণ এবং জোয়ারের পানিতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে প্লাবিত হয়েছে অসংখ্য মাছের ঘের, পুকুর ও জলাশয়। এতে একদিকে যেমন কৃষকের পরিশ্রমে উৎপাদিত ফসল নষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে মাছ ও মাছের পোনা ভেসে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন হাজারো মৎস্যচাষি। প্রাথমিক হিসাবে কৃষি ও মৎস্য খাতে মোট ক্ষতির পরিমাণ ৩৮ কোটি টাকারও বেশি বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, কৃষি খাতে প্রায় ১৮ কোটি এবং মৎস্য খাতে ২০ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে নদী ও সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে পটুয়াখালী জেলায় পাঁচ জেলের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের কৃষিজমি। পাকা ধান, শাকসবজি, রোপা আমনের বীজতলা এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফসল দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকায় সদ্য রোপণ করা ধানের চারা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে কৃষকদের মধ্যে নতুন করে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। বাজারেও সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলের পাঁচ জেলায় ৪১ হাজারেরও বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন ফসল নষ্ট হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা। জেলার মধ্যে বরগুনায় সবচেয়ে বেশি জমি প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে পিরোজপুরে সবচেয়ে বেশি জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছে ভোলা জেলা।
মৎস্য খাতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। কয়েক হাজার মাছের খামার, পুকুর ও জলাশয় প্লাবিত হওয়ায় শত শত টন মাছ এবং কোটি কোটি মাছের পোনা ভেসে গেছে। রুই, কাতলা, মৃগেল, মাগুর, কৈসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ হারিয়ে মৎস্যচাষিরা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেকেই জাল দিয়ে ঘের রক্ষার চেষ্টা করলেও প্রবল জোয়ার ও বৃষ্টির কারণে তা সম্ভব হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিরা জানান, বছরের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ এক মুহূর্তেই পানিতে ভেসে গেছে। এখন সরকারি সহায়তা ছাড়া নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। তারা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে ক্ষতিপূরণ, কৃষি উপকরণ এবং সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। অন্যদিকে মৎস্য বিভাগও ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের তালিকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে পুনর্বাসন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ধাক্কা শুধু কৃষক ও মৎস্যচাষিদের নয়, দেশের খাদ্য উৎপাদন এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।



