প্রকাশিত: আগস্ট ২৮, ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া তথ্যের মধ্যে অসংগতি রয়েছে বলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সময়, কারণ এবং অভিযুক্তদের ভূমিকা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
গত ২৪ ও ২৫ আগস্ট আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রংপুরে গিয়ে ঘটনাস্থল ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শন করে। এ সময় তারা নিহতদের স্বজন ও প্রতিবেশী, অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্য, পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা, হাসপাতাল ও মর্গসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর মুঠোফোন থেকে রাত ২টা ৪০ মিনিটে করা একটি ফোনকল। তাঁর বোন পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে আগের রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রীতিলতার শেষ কথা হয়েছিল বলে জানা গেছে। কিন্তু পরদিন ভোররাতে তাঁর নম্বর থেকে পূজার কাছে একটি ফোন যায়। পূজা সেই ফোন ধরতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এত রাতে প্রীতিলতা সাধারণত ফোন করতেন না।
এই ফোনকলটি হত্যাকাণ্ডের সময়ের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, সেটি নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। ফোনটি কে করেছিলেন, কতক্ষণ কথা হয়েছিল, ওই সময় মুঠোফোনটির অবস্থান কোথায় ছিল এবং পরিবারের সদস্যদের ফোন কখন বন্ধ হয়েছিল—এসব তথ্য কলের বিস্তারিত রেকর্ড, মুঠোফোনের অবস্থান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিন আলামত বিশ্লেষণ করে যাচাই করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পুলিশের বক্তব্যেও পরিবর্তন এসেছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ জানিয়েছিল, বাড়ির ছাদে মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরোধ হয় এবং পরে তাঁকে ও পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়। পরবর্তী বক্তব্যে জমিজমা নিয়ে বিরোধের সম্ভাবনাও তদন্তে যুক্ত হয়েছে।
পুলিশের দাবি, হত্যার পর অভিযুক্তরা কিছু সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। এ দাবি সত্য হলে ঘটনাস্থলে তাঁদের মুঠোফোনের তথ্য, আঙুলের ছাপ, চুল, ত্বকের কোষসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আলামত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ঘরের বিভিন্ন স্থান, দরজা-জানালা, আসবাব, খাবারের পাত্র, বাথরুম ও অন্যান্য জায়গা থেকে যথাযথভাবে আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করার ওপর জোর দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র।
অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া বক্তব্যও তদন্তের অন্যান্য তথ্য ও আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ময়নাতদন্ত, রাসায়নিক পরীক্ষা ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদনকে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি এরই মধ্যে উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্তের বিভিন্ন দিক যাচাই করার কথা জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে রংপুরের এই চার হত্যাকাণ্ডে রাত ২টা ৪০ মিনিটের ফোনকল, অভিযুক্তদের কথিত অবস্থান, হত্যার কারণ এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত বৈজ্ঞানিক আলামত এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতে, অনুমান বা বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে এসব প্রশ্নের উত্তর বস্তুগত ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।



