প্রকাশিত: আগস্ট ২৮, ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায় এক বিধবার নামে বরাদ্দ সরকারি ভাতার অর্থ প্রায় ছয় বছর ধরে অন্য একটি মুঠোফোনভিত্তিক হিসাবে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওই হিসাবটি টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আব্দুল খালেকের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে খোলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। তার দাবি, ২০২০ সালের পর থেকে তিনি আর বিধবা ভাতার কোনো অর্থ হাতে পাননি। অথচ সরকারি হিসাবে তার নামে নিয়মিত ভাতা বরাদ্দ ও পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা নারী হলেন টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের বানেশ্বরপাড়া এলাকার মোছা. রহিমা বেগম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বিধবা ভাতা কর্মসূচির সুবিধাভোগী। রহিমা জানান, ২০২০ সালের জুলাইয়ে তিনি সর্বশেষ বিধবা ভাতার টাকা পেয়েছিলেন। এরপর ভাতার অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগীদের মুঠোফোন হিসাবে পাঠানোর ব্যবস্থা চালু হলেও তার কাছে আর কোনো টাকা পৌঁছায়নি।
দীর্ঘ সময় ধরে ভাতা না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে একপর্যায়ে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন রহিমা। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তার নামে ভাতার অর্থ নিয়মিত পাঠানো হচ্ছে। তবে যে মুঠোফোন নম্বরে টাকা পাঠানো হচ্ছে, সেটি তার নিজের নয়। নম্বরটি তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল।
পরে ওই নম্বর সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে রহিমা জানতে পারেন, নম্বরটির সঙ্গে থাকা অর্থ লেনদেনের হিসাবটি ইউপি সদস্য আব্দুল খালেকের পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে খোলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় তার মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয় এবং বিষয়টি স্থানীয়ভাবে জানাজানি হলে ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রহিমা বেগমের নামে বরাদ্দ বিধবা ভাতার অর্থ ওই হিসাবেই পাঠানো হয়েছে। এমনকি চলতি বছরের মে মাসেও তার নামে ১ হাজার ৯৬১ টাকা পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে গত প্রায় ছয় বছরে রহিমার নামে প্রায় ৪০ হাজার টাকা বিধবা ভাতা পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, পাঠানো অর্থগুলো পরবর্তী সময়ে উত্তোলনও করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী রহিমা বেগমের অভিযোগ, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের ভাই তার ছেলের কাছে ৭ হাজার টাকা দিয়ে যান। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যেন আর বাড়াবাড়ি না করা হয়, সে কথাও বলা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। তবে এই অর্থ কেন দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
রহিমা বলেন, তিনি ২০২০ সালের পর থেকে বিধবা ভাতার কোনো টাকা পাননি। পরে সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করেই জানতে পারেন, তার নামে বরাদ্দ অর্থ অন্য একটি নম্বরে চলে যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নেওয়ার পর ওই নম্বরটি ইউপি সদস্য আব্দুল খালেকের বলে জানতে পারেন বলে দাবি করেন তিনি।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য মো. আব্দুল খালেক। তার দাবি, কীভাবে ওই নারীর ভাতার সঙ্গে তার মুঠোফোন নম্বর যুক্ত হলো, তা তিনি জানেন না। রহিমা বেগমের ভাতার কার্ড তৈরির সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করেন। তার আরও বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট সিমটি প্রায় চার বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল।
সিম হারানোর পর এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে আব্দুল খালেক জানান, তিনি কোনো সাধারণ ডায়েরি করেননি। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তবে সিম হারিয়ে যাওয়ার পরও কেন সাধারণ ডায়েরি করা হয়নি এবং তিনি টাকা উত্তোলন না করে থাকলে বিষয়টি নিয়ে সমঝোতার প্রয়োজন কেন হলো—এমন প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি তিনি।
এ ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে কার মাধ্যমে ভাতার অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় একজন সুবিধাভোগীর পরিবর্তে অন্য একটি হিসাবে টাকা পাঠানো হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি ভাতার মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ প্রকৃত সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে বিষয়টি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
দেবীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আবু রায়হান জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজীত সাহা বলেছেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এখন তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ হবে, রহিমা বেগমের নামে বরাদ্দ ভাতার অর্থ কীভাবে একটি ভিন্ন হিসাবে গেছে, কারা ওই অর্থ উত্তোলন করেছেন এবং এর পেছনে কারও অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসতে পারে।



