প্রকাশিত: আগস্ট ২৮, ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে ব্যতিক্রমী এক আয়োজন করে এলাকায় আলোচনার জন্ম দিয়েছেন এক দম্পতি। মৃত্যুর পর স্বজন ও পরিচিতজনদের উদ্যোগে যে ধরনের চল্লিশার আয়োজন হয়ে থাকে, সেটিই জীবিত অবস্থায় করে ফেলেছেন তারা। তবে এই আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল না আনুষ্ঠানিকতা; বরং অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া এবং তাদের দোয়া পাওয়া।
শুক্রবার উপজেলার জিনারী ইউনিয়নের বীর হাজীপুর গ্রামে এ বিশেষ ভোজের আয়োজন করেন ৬২ বছর বয়সী মো. রফিকুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী বেগম আক্তার। তাঁদের উদ্যোগে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে খাবার খাওয়ানো হয়েছে। আয়োজনকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। নানা বয়সী মানুষ এতে অংশ নেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বীর হাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে সকাল থেকেই রান্না ও খাবার পরিবেশনের প্রস্তুতি শুরু হয়। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চলে ভোজের কার্যক্রম। অতিথিদের বসে খাওয়ার জন্য মাঠজুড়ে বড় শামিয়ানা টাঙানো হয়। পাশাপাশি চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা করা হয়। একসঙ্গে কয়েক শ মানুষ যাতে খাবার গ্রহণ করতে পারেন, সে অনুযায়ী পুরো আয়োজন সাজানো হয়েছিল।
ভোজের খাবারের তালিকায় ছিল গরুর মাংস, মাছের মুড়িঘণ্ট, ডাল ও পায়েস। আয়োজনে এলাকার দরিদ্র, অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও অংশ নেন। এত বড় পরিসরে ব্যতিক্রমী ভোজের আয়োজন হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়।
আয়োজক রফিকুল ইসলাম জানান, তাঁর এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে একটি ব্যক্তিগত চিন্তা। তাঁর দুই সন্তান বাক্প্রতিবন্ধী। ভবিষ্যতে তিনি মারা গেলে সন্তানদের পক্ষে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের নিয়ে প্রচলিত নিয়মে কোনো আয়োজন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তাঁর মনে সংশয় ছিল। সেই ভাবনা থেকেই জীবিত থাকতেই নিজের ইচ্ছায় মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
রফিকুলের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবদ্দশায় মানুষের সামনে বসে নিজের হাতে খাবার তুলে দেওয়ার ইচ্ছা তাঁর দীর্ঘদিনের। মৃত্যুর পর কী হবে, সে চিন্তার চেয়ে বেঁচে থাকতেই মানুষের দোয়া ও ভালোবাসা পাওয়াকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই ভাবনা থেকেই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এত বড় আয়োজনের উদ্যোগ নেন।
তিনি জানান, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের রাস্তার পাশে নির্মাণাধীন দোকান এবং জমির একটি বড় অংশ থেকে পাওয়া প্রায় এক কোটি ৮৮ লাখ টাকার অর্থ থেকে এই আয়োজনের ব্যয় বহন করা হয়েছে। তাঁর হিসাবে, পাঁচ হাজার মানুষের খাবারের এই আয়োজন সম্পন্ন করতে প্রায় নয় লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, মানুষের দোয়া পাওয়ার পাশাপাশি পরকালের সওয়াবের প্রত্যাশাও তাঁর এই উদ্যোগের অন্যতম কারণ। জীবিত থাকা অবস্থায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের চোখের সামনে তাদের খাবার গ্রহণ করতে দেখা তাঁর কাছে আনন্দের বিষয়। তাই প্রচলিত রীতির অপেক্ষা না করে নিজের ইচ্ছাতেই আয়োজনটি করেছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ঘটনাটি বেশ ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। রফিকুল ইসলামের চাচাতো ভাই মো. শামীম হোসেন জানান, এ ধরনের আয়োজন এলাকায় আগে দেখা যায়নি। বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশ নিয়েছেন এবং আনন্দের সঙ্গে খাবার গ্রহণ করেছেন।
স্থানীয়দের অনেকে মনে করছেন, মৃত্যুর পর আনুষ্ঠানিক আয়োজনের পরিবর্তে জীবিত অবস্থায় মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করার বিষয়টি ভিন্ন ধরনের সামাজিক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এমন উদ্যোগ তাদের প্রতি সহমর্মিতার প্রকাশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
রফিকুল দম্পতির এই আয়োজন ঘিরে শুধু বীর হাজীপুর নয়, আশপাশের এলাকাতেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ এটিকে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ জীবিত অবস্থায় মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার একটি মানবিক প্রচেষ্টা হিসেবে প্রশংসা করছেন।
সব মিলিয়ে মৃত্যুর পরের আনুষ্ঠানিকতার প্রচলিত ধারণাকে ভিন্নভাবে দেখিয়ে রফিকুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী যে আয়োজন করেছেন, তা স্থানীয় মানুষের মধ্যে কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিজের জীবদ্দশাতেই হাজারো মানুষের মুখে খাবার তুলে দিয়ে তাঁদের দোয়া পাওয়ার যে ইচ্ছা থেকে এই উদ্যোগ, সেটিই শেষ পর্যন্ত ঘটনাটিকে করে তুলেছে ব্যতিক্রমী ও আলোচিত।



