রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শিক্ষককে হেনস্তার অভিযোগ, বিএনপি নেতা ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৯, ২০২৬, ০৯:০৯ পিএম

শিক্ষককে হেনস্তার অভিযোগ, বিএনপি নেতা ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে

সংগৃহীত

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এডহক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে প্রধান শিক্ষক মিল্টন বিকাশ দাশকে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতা তসলিম উদ্দিন ও তাঁর ছোট ভাই মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে। প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে তাঁকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয় এবং কমিটি গঠনসংক্রান্ত একটি নথি হস্তান্তরের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপি নেতা ও তাঁর ভাই দাবি করেছেন, প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

ঘটনাটি গত বৃহস্পতিবার সকালে ঘটেছে বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়ভাবে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন প্রধান শিক্ষককে প্রকাশ্যে হেনস্তার অভিযোগের ঘটনায় বিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

প্রধান শিক্ষক মিল্টন বিকাশ দাশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে তিনি অটোরিকশায় করে বিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হন। ফকিরপাড়ার প্রবেশপথে পৌঁছালে তসলিম উদ্দিন, মহিউদ্দিনসহ কয়েকজন তাঁর অটোরিকশার গতিরোধ করেন। পরে তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নেওয়া হয় এবং তাঁর মুঠোফোন নিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। এরপর বিদ্যালয়ের এডহক কমিটি গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি নথি তাঁদের কাছে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়।

প্রধান শিক্ষক জানান, ওই সময় বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও একজন কর্মচারী সেখানে এগিয়ে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে তাঁরা বিদ্যালয়ে যান। ঘটনার খবর পেয়ে কয়েকজন অভিভাবক ও স্থানীয় লোকজন বিদ্যালয়ে উপস্থিত হলে সেখানে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে বলে তিনি দাবি করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তাঁর দাবি, ওই পরিস্থিতিতে তিনি অনেকটা বাধ্য হয়েই সংশ্লিষ্ট নথিটি তাঁদের হাতে তুলে দেন।

এডহক কমিটির সভাপতি মনোনয়ন নিয়েও আপত্তির কথা জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। তাঁর দাবি, সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু প্রস্তাবিত তিনজনের তালিকায় থাকা একজনের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ দেওয়া হয়নি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাইলেও তা দেওয়া হয়নি বলে দাবি তাঁর। এরপরও নিয়ম মেনে নথি উপজেলা পর্যায়ে পাঠানোর জন্য তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, তিনি নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে রাজি না হওয়ায় তাঁর সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন বলেও জানান তিনি।

তবে প্রধান শিক্ষকের এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা তসলিম উদ্দিন। তাঁর দাবি, তাঁদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিদ্যালয়ের এডহক কমিটি গঠনের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁরা যোগাযোগ করেছিলেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে আবদুল ওহাবকে সভাপতি করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

তসলিম উদ্দিনের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওই সুপারিশ মানতে রাজি হননি। এমনকি বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারকে বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে দেওয়া হবে না—এমন বক্তব্যও তিনি দিয়েছেন বলে দাবি করেন তসলিম। তাঁর বক্তব্য, বিদ্যালয়ের পরিচালনা ও শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য যোগ্য ও ভালো মানুষদের সম্পৃক্ত করতে তাঁরা আগ্রহী।

তসলিম উদ্দিনের ছোট ভাই মহিউদ্দিনও প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে কোনো নথি ছিনিয়ে নেওয়া হয়নি এবং তাঁর সঙ্গে খারাপ আচরণও করা হয়নি। বিদ্যালয়ের কার্যালয়ে গিয়ে তাঁরা নথি চাইলে প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তা দিতে অস্বীকৃতি জানান বলে দাবি করেন তিনি। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে প্রধান শিক্ষকের বাসা থেকে নথিটি সংগ্রহ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠায় বলে জানান মহিউদ্দিন।

ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাবেক শিক্ষার্থী আরফাদুল ইসলাম, ইমরান হোসেনসহ অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁরা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

ঘটনার বিষয়ে সাতকানিয়া থানার উপপরিদর্শক মামুন জানান, খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত বিদ্যালয়ে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

সাতকানিয়া উপজেলার একাডেমিক তত্ত্বাবধায়ক আশীষ বরণ দেব জানান, এডহক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করেই মূলত সমস্যার সূত্রপাত হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় বিষয়টি দেখা হচ্ছে।

এদিকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া বলেন, শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান শিক্ষককে হেনস্তার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে ওই শিক্ষক আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন। তাঁর মতে, ঘটনার সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বর্তমানে সেখানে বিএনপির কোনো সাংগঠনিক কমিটি না থাকায় দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি।

বিদ্যালয়ের এডহক কমিটি গঠন নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিরোধ এখন স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। একদিকে প্রধান শিক্ষকের পক্ষ থেকে হেনস্তা ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে তা অস্বীকার—দুই ধরনের বক্তব্যই সামনে এসেছে। ফলে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!