প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ০৬:৫৩ পিএম
ঠাকুরগাঁওয়ের একটি হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে অন্য শিশুদের সঙ্গে থাকার কথা ছিল সাড়ে চার বছরের রায়াতের। কিন্তু খেলাধুলা আর হাসি-আনন্দের বয়সে হাসপাতালের বিছানাই এখন তার নিত্যসঙ্গী। দুই কিডনিতে পানি জমে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছে শিশুটি। মাঝেমধ্যে তীব্র ব্যথায় ছটফট করে সে। ফুলে যায় চোখ ও পেট। ব্যথা কিছুটা কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে দিতে হয় দামি ইনজেকশন।
রায়াতের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া উপজেলার কশালগাঁও-রেলস্টেশন এলাকায়। দিনমজুর নূর আলম ও রুপালী বেগম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে সে দ্বিতীয়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। নিজেদের কোনো ভিটেমাটিও নেই। সরকারি জমি লিজ নিয়ে সেখানে বসবাস করছে পরিবারটি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় দেড় বছর আগে রায়াতের দুই কিডনিতে পানি জমার বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ চিকিৎসাযাত্রা। কখনো কিছুদিন তুলনামূলক স্বস্তিতে থাকলেও হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হয়। সেই সময় শিশুটির চোখ ও পেট ফুলে যায় এবং অসহ্য যন্ত্রণায় কাঁদতে থাকে সে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথা বেড়ে গেলে রায়াতকে কয়েক ধরনের ইনজেকশন দিতে হয়। এর মধ্যে একটি ইনজেকশনের দাম প্রায় ছয় হাজার টাকা বলে পরিবার জানিয়েছে। একজন দিনমজুরের পরিবারের জন্য প্রতিবার এমন ব্যয় বহন করা অত্যন্ত কঠিন। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের পাশাপাশি সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ইতোমধ্যে পরিবারটি নিঃস্ব হওয়ার পথে।
বর্তমানে প্রায় এক মাস ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রায়াত। দিনের পর দিন হাসপাতালের বিছানায় কাটছে তার সময়। কখনো ওষুধ ও ইনজেকশনের পর ব্যথা কিছুটা কমে আসে। আবার কিছু সময় পর নতুন করে যন্ত্রণা শুরু হয়। তখন অসহায় হয়ে পড়ে শিশুটির পরিবার।
শিশুটির সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের কষ্টের কথা জানায় রায়াত। সে বলে, তার কিডনিতে সমস্যা এবং ব্যথা হলে অনেক কষ্ট হয়। সে বাঁচতে চায় এবং সুস্থ হয়ে কোরআনের হাফেজ হওয়ার স্বপ্ন দেখে। তার সরল আকুতি শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পাশে থাকা স্বজনরা।
রায়াতের মা রুপালী বেগম জানান, সন্তানের কষ্ট তিনি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারেন না। ছেলে যখন ব্যথায় কাঁদে, তখন তার নিজেরও অসহায় লাগে। কিন্তু চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর মতো অর্থ এখন তাদের হাতে নেই। সন্তানের চিকিৎসা চালাতে গিয়ে পরিবারের সঞ্চিত সামান্য সম্পদও শেষ হয়ে গেছে।
ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাতে এরই মধ্যে চারটি গবাদিপশু বিক্রি করেছেন রায়াতের বাবা নূর আলম। পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গা থেকে ধারদেনাও করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা চলতে থাকায় সেই অর্থও শেষ হয়ে এসেছে। দিনমজুরি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে পরিবারের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ওপর নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ ও ইনজেকশনের ব্যয় বহন করতে গিয়ে তিনি এখন চরম আর্থিক সংকটে রয়েছেন।
পরিবারের দাবি, চিকিৎসকদের কাছ থেকে তারা জানতে পেরেছেন, রায়াতের বয়স ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা সম্ভব নয়। ফলে আপাতত ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে তার ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে একদিকে শিশুটির দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিবার অসুস্থতা বাড়লে নতুন করে অর্থের প্রয়োজন পড়ছে।
রায়াতের প্রতিবেশীরা জানান, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিকভাবে অসচ্ছল। ছেলের চিকিৎসা চালাতে গিয়ে তাদের অনেক সম্পদ বিক্রি হয়ে গেছে। নূর আলমের মতো একজন দিনমজুরের পক্ষে এত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ চালানো প্রায় অসম্ভব। তারা শিশুটির পাশে দাঁড়াতে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
রায়াতের পরিবারের সদস্যরাও সন্তানের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সহযোগিতা চেয়েছেন। তাদের আশা, সমাজের হৃদয়বান মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এলে শিশুটির চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কারণে চিকিৎসা যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়ে যায়—এটাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
এদিকে রায়াতের অসুস্থতার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরেও এসেছে। রুহিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবারটি সহায়তার জন্য আবেদন করলে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
একটি শিশুর জন্য এই বয়সে হাসপাতালের বিছানায় দিন কাটানো নিঃসন্দেহে কঠিন। যে বয়সে তার মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠার কথা, সেই বয়সেই তাকে নিয়মিত চিকিৎসা ও ব্যথার সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে। তার ছোট্ট স্বপ্ন—সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া এবং কোরআনের হাফেজ হওয়া।
রায়াতের পরিবারের আর্থিক সংকট ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে শিশুটির চিকিৎসা অব্যাহত রাখা সহজ হবে। একই সঙ্গে তার চিকিৎসার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।



