রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নারী থেকে পুরুষ হওয়ার স্বপ্ন, অপারেশনের পর যুবতীর মৃত্যু

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

নারী থেকে পুরুষ হওয়ার স্বপ্ন, অপারেশনের পর যুবতীর মৃত্যু

ছবি: সংগৃহীত

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া গ্রামের রোজি আক্তার লিজা নামের ৩১ বছর বয়সী এক তরুণীর পুরুষ হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে করা অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যু হয়েছে। ঢাকার পান্থপথ এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্তন অপসারণের অস্ত্রোপচারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, লিজা ছোটবেলা থেকেই প্রচলিত মেয়েদের পোশাক-আচরণে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি ছেলেদের মতো চুল কাটতেন এবং চলাফেরাতেও পুরুষালি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতেন। বিয়ের ক্ষেত্রেও তার অনাগ্রহ ছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে দুইবার বিয়ে দেওয়া হলেও কোনো সংসারই স্থায়ী হয়নি। স্বাভাবিক দাম্পত্যজীবনের প্রতি তার আগ্রহ ছিল না বলে জানিয়েছেন তার মা।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় গিয়ে লিজা হরমোন-সংক্রান্ত চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। নিজেকে পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছা থেকেই ধাপে ধাপে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এ উদ্দেশ্যে প্রথম পর্যায়ে স্তন অপসারণের অস্ত্রোপচার করানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

জানা যায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর লিজাকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার নাম ‘সরফরাজ’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয় এবং লিঙ্গের ঘরে পুরুষ উল্লেখ করা হয়। অস্ত্রোপচারের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে হাসপাতালে ভর্তি ও অস্ত্রোপচারের নথিতে নাম ও পরিচয় পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে পরিবারের মধ্যেও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে।

লিজার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা জেনিফা আক্তার জানান, তারা পরস্পরের বাসায় যাতায়াত করতেন এবং একসঙ্গে সময় কাটাতেন। লিজা তাকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে ভাবতেন বলেও জানা গেছে। অস্ত্রোপচারের আগে হাসপাতালের সম্মতিপত্রে জেনিফা নিজেকে লিজার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়ে স্বাক্ষর করেন। তার দাবি, লিজার মা-বাবার সম্মতি নিয়েই তিনি ওই নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন।

তবে লিজার বাবা আব্দুর রব হাওলাদার এ বিষয়ে ভিন্ন কথা জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, অস্ত্রোপচারের সম্মতিপত্রে জেনিফা স্বাক্ষর করবেন—এমন বিষয় তিনি জানতেন না। এমনকি হাসপাতালে লিজার নাম পরিবর্তন করে ‘সরফরাজ’ রাখা হয়েছে, সেটিও মৃত্যুর আগে তার জানা ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।

লিজার বাবা আরও জানান, তার মায়ের কাছ থেকে তিনি শুনেছিলেন, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুরুষ হওয়ার পর লিজা জেনিফাকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাকে অনেক সময় অবহিত করা হতো না বলেও আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।

লিজার মা ফজিলা বেগম জানান, তার মেয়ে ছোটবেলা থেকেই কোনো পুরুষের প্রতি দাম্পত্য আগ্রহ দেখাতেন না। দুইবার বিয়ে হলেও কোনো সংসারেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করেননি। দীর্ঘদিন ধরে জেনিফা তাদের বাড়িতে লিজার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হিসেবে যাতায়াত করতেন। সে কারণে মেয়ের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের বিষয়ে জেনিফার ওপরও তারা নির্ভর করেছিলেন বলে জানান তিনি।

মৃত্যুর পর হাসপাতাল থেকে দেওয়া সনদেও লিজার পরিবর্তিত নাম ও পুরুষ পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে তার প্রকৃত পরিচয়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় ব্যবহৃত নাম এবং অস্ত্রোপচারের অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে, অস্ত্রোপচারের পর লিজার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়েও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। অস্ত্রোপচারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু হওয়ায় চিকিৎসা-প্রক্রিয়া, অস্ত্রোপচারের আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং অস্ত্রোপচারের পর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। হাসপাতালের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করার কথা জানান। পরে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

লিজার আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের আগে তার শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসাগত প্রস্তুতি, হাসপাতালের অনুমোদন, নথিতে পরিচয় পরিবর্তন এবং অস্ত্রোপচারের পর পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ ছিল কি না—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাদের মতে, একজন রোগীর ব্যক্তিগত পরিচয় বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, অস্ত্রোপচারের আগে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরবর্তী সময়ে রোগীকে যথাযথ পর্যবেক্ষণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই লিজার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা প্রয়োজন।

লিজার পরিবারও ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে চান। অস্ত্রোপচারের সঙ্গে কোনো ধরনের চিকিৎসাগত ত্রুটি, অবহেলা কিংবা নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রম ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে এ ধরনের জটিল অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও চিকিৎসা-ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, সেটিও যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!