প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম
ইরানের প্রতি রাশিয়ার সমর্থন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়াকে দুর্বল বা গ্রাস করার চেষ্টা করলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়েও নিজের কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন পুতিন। সেখানে ইরানের চলমান সংকট ও দেশটির প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়। পুতিন জানান, কঠিন সময়ে ইরানকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে রাশিয়া এবং প্রয়োজনীয় পণ্যও সরবরাহ করা হচ্ছে।
বৈঠকে পেজেশকিয়ান রাশিয়ার অবস্থানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ককে কৌশলগত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করলে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা চাপ ও নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করা সম্ভব। ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও অব্যাহত রাখার কথা জানান পুতিন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই পুতিনের এই বক্তব্য এসেছে। এর আগে দুই দেশের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। তাঁর ভাষ্য, যুদ্ধবিরতি ছিল অত্যন্ত দুর্বল এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
ইরানের প্রতি সমর্থনের পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্দেশেও কঠোর বার্তা দিয়েছেন পুতিন। তিনি রাশিয়াকে খাদ্যশৃঙ্খলের নিচের দিকে ঠেলে দেওয়া, দুর্বল করা কিংবা গ্রাস করার চেষ্টা হলে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেন। তাঁর বক্তব্যে রাশিয়া পশ্চিমা চাপ মোকাবিলায় প্রস্তুত—এমন অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে।
পুতিনের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই দূরপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। রাশিয়ার বিভিন্ন স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ইউক্রেনের হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন পুতিন।
রুশ প্রেসিডেন্টের দাবি, গত কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার বেশ কিছু জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এতে দেশটির অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এসব হামলার প্রভাব রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ছে। তবে এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা হামলার অভিযোগ রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধের কারণে সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধের অবসান ঘটাতে বিভিন্ন পক্ষ আলোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে সংঘাত এখনো অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের দূরপাল্লার হামলা আরও তীব্র হয়েছে।
এদিকে ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলে রুশ বাহিনীর অগ্রগতি নিয়েও পুতিন দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ওই অঞ্চলে রুশ বাহিনী ২৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখলে নিয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন সূত্রের হিসাবে রুশ বাহিনীর অগ্রগতির পরিমাণ পুতিনের দাবির চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে ২৭০ বর্গকিলোমিটার দখলের বিষয়টি রুশ প্রেসিডেন্টের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
পুতিন আরও জানিয়েছেন, দোনেৎস্কের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহরের দিকে রুশ বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতির কথাও বলেছেন তিনি। এতে ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলেও জানিয়েছেন পুতিন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করতে মস্কো স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, যাদের সঙ্গে রাশিয়ার পরিচয় ও পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক রয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে মস্কোর আপত্তি নেই।
রাশিয়া-ইরান ঘনিষ্ঠতা সাম্প্রতিক সময়ে আরও দৃশ্যমান হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বাড়ছে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পাশাপাশি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে বিশকেকে পুতিনের বক্তব্যে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—ইরানের প্রতি রাশিয়ার অব্যাহত সমর্থন এবং পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার বার্তাও দিয়েছেন তিনি। ফলে রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক এবং ইউক্রেন যুদ্ধ—দুই ক্ষেত্রেই মস্কোর অবস্থান আপাতত কঠোরই থাকছে।



