প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম
ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নাম নিজের নামে পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার দেওয়া এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তায় তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই জলপথের নাম পরিবর্তন করে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ রাখা যায় কি না।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন সময়ে সামনে এলো, যখন হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে তীব্র হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়ে থাকে। ফলে সেখানে সামরিক সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।
ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেই দাবির ভিত্তিতেই তিনি জলপথটির নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আনেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দপ্তরের পক্ষ থেকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি মানচিত্র প্রকাশ করা হয়, যেখানে হরমুজ প্রণালিকে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের এই নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবের অর্থ এই নয় যে আন্তর্জাতিকভাবে হরমুজ প্রণালির নাম বদলে গেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলপথটির প্রচলিত নাম এখনো হরমুজ প্রণালিই। নাম পরিবর্তনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থাকলেও কোনো আন্তর্জাতিক জলপথের নাম একতরফাভাবে বদলে তা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি আলাদা।
এদিকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীত। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জলপথটি নিরাপদ ও চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকার দাবি করা হলেও ইরান এটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে দাবি করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে জাহাজ চলাচলও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
হরমুজকে ঘিরে উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় চার শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানি তেলের খুচরা মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ফলে যুদ্ধের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগও বাড়ছে।
এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সৌদি আরবও একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে যুক্ত সামরিক সূত্রগুলো জলপথটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি জোরালো করছে। এসব পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্পের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবকে অনেকে তাঁর সাম্প্রতিক ভৌগোলিক নাম পরিবর্তনের উদ্যোগের ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখছেন। এর আগে কানাডার সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে লেক অন্টারিওর নাম ‘লেক আমেরিকা’ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। একইভাবে মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। কারণ এটি শুধু একটি ভৌগোলিক নাম নয়, বরং বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। এই জলপথকে ঘিরে সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অবস্থায় যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্পের ‘ট্রাম্প প্রণালি’ নামের প্রস্তাব নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও প্রস্তাবটি এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্যের পর্যায়েই রয়েছে, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ ও নাম পরিবর্তনের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করবে চলমান সংঘাত ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।



