প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ১০:০৯ এএম
বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত পরিবর্তন এল নিনো এবার অস্বাভাবিক শক্তিশালী রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা, আকস্মিক বন্যা ও শক্তিশালী ঝড়ের মতো দুর্যোগ বাড়তে পারে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, পৃথিবী ক্রমেই এমন একটি অনিশ্চিত আবহাওয়াগত পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে জলবায়ুর স্বাভাবিক ভারসাম্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা ইতোমধ্যেই বেড়েছে। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার চরমতা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের এল নিনো কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। এই প্রভাব দীর্ঘ সময় স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া। এই উষ্ণতার কারণে বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরন বদলে যায়। এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না; পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের আবহাওয়া ও জলবায়ুতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোনো কোনো অঞ্চলে দীর্ঘ সময় বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন, পানির সরবরাহ ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে কিছু এলাকায় অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও শক্তিশালী ঝড়ের প্রবণতা বাড়তে পারে। ফলে একই সময়ে বিশ্বের এক প্রান্তে খরা এবং অন্য প্রান্তে বন্যার মতো বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমুদ্রের অস্বাভাবিক উষ্ণতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে গেলে সামুদ্রিক পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে। বিশেষ করে প্রবালপ্রাচীর, সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও বিভিন্ন প্রাণীর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চল ও তাসমানিয়া অঞ্চলের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত উষ্ণতার কারণে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ সৃষ্টি হলে প্রবাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শৈবালের অস্বাভাবিক বিস্তার এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দরিদ্র ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের মানুষের কাছে দ্রুত আবহাওয়ার পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়া এবং জরুরি প্রস্তুতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাব সব দেশে একই রকম হবে না। তবে যেসব অঞ্চলে আগে থেকেই জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য ও দুর্যোগের ঝুঁকি বেশি, সেখানে এর প্রভাব তুলনামূলক ভয়াবহ হতে পারে। খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপরও তৈরি হতে পারে অতিরিক্ত চাপ।
সব মিলিয়ে শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে সতর্কতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, নির্ভুল পূর্বাভাস এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা জোরদার করাকেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।



