প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬, ১০:২৩ পিএম
বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রমে স্বাধীন নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর আবারও গুরুত্ব দিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে একটি স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।
সোমবার জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয়ে মানবাধিকার কাউন্সিলের ৬৩তম অধিবেশনে বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে হালনাগাদ বক্তব্য দেওয়ার সময় বাংলাদেশ প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন ফলকার তুর্ক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নজরদারি করতে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা জাতিসংঘ আগেও জানিয়েছে।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সেগুলোর তদন্ত যেন স্বাধীনভাবে করা যায়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের আন্দোলন ঘিরে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয়ের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের পাশাপাশি নিরাপত্তা খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বেসামরিক তদারকি এবং জবাবদিহি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও কার্যকর ও স্বাধীন করার বিষয়টিও ওই সুপারিশে উঠে আসে। জাতিসংঘের মতে, কমিশনকে এমন ক্ষমতা দিতে হবে যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্ত করতে পারে। তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে কমিশনের স্বাধীনতা যাতে কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা জরুরি বলে মনে করছে জাতিসংঘ। এর মাধ্যমে অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, দায় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পথ আরও সুগম হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বলপূর্বক গুমসংক্রান্ত আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী, অধিকারভিত্তিক সংগঠন এবং আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, স্বাধীন তদন্তের সুযোগ, পর্যাপ্ত ক্ষমতা এবং জবাবদিহির কাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের নতুন করে দেওয়া এই আহ্বানকে তাই বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতের সংস্কারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে তদন্তের সুযোগ তৈরি করা এবং অভিযোগের নিষ্পত্তিতে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ভূমিকা দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
ফলকার তুর্ক তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের মৃত্যুর বিষয়ও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালেই অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে থাকা অবস্থায় ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে অভিবাসীদের জোরপূর্বক এমন দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়েও তিনি সমালোচনা করেন, যেসব দেশ তাদের জন্য নিরাপদ নয় বা যেখানে তারা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
তবে বাংলাদেশের প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর কার্যকর ও স্বাধীন নজরদারি প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। জাতিসংঘের এই সুপারিশ বাস্তবায়নে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, তদন্তক্ষমতা ও জবাবদিহির কাঠামো কতটা শক্তিশালী করা হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



