রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইরানে বিয়েবাড়িতে সরাসরি আঘাত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ০৩:২২ পিএম

ইরানে বিয়েবাড়িতে সরাসরি আঘাত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের

ছবিঃ সংগৃহীত

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় চারজন নিহত ও অন্তত ৬৮ জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার দেশটির ছোট শহর কুহেস্তাকে এ ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের পর ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও ঘটনাস্থলের বিভিন্ন ছবি ও দৃশ্য বিশ্লেষণ করে কয়েকজন সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞের ধারণা, ঘটনাটি কাছাকাছি কোনো স্থাপনায় হামলার পর ধ্বংসাবশেষ ছিটকে এসে ঘটেনি; বরং ভবনটিতে সরাসরি কোনো অস্ত্র আঘাত হানার সম্ভাবনাই বেশি।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের দাবি, ব্যবহৃত অস্ত্রটি ইরানের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র না হয়ে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত কোনো অস্ত্র হতে পারে। তবে হামলার প্রকৃত কারণ, অস্ত্রের ধরন এবং কারা এর জন্য দায়ী—এসব বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

ঘটনার সময় ওই এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বিস্ফোরণের পর আহতদের দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। হতাহতদের মধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠানের কয়েকজন অতিথিও রয়েছেন বলে বিভিন্ন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংগঠনের তথ্য থেকে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে ৪৩ বছর বয়সী কলসুম মোল্লাহী নাজহানদানিয়া, ৫০ বছর বয়সী জারখাতুন তাহেরি এবং চার বছর বয়সী আমির মোহাম্মদ কারিমির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ মল্লাহী কাছাকাছি একটি যোগাযোগ স্থাপনার পাশে মোটরসাইকেলে থাকা অবস্থায় নিহত হন বলে জানানো হয়েছে।

ঘটনাটির সঙ্গে কাছাকাছি থাকা একটি যোগাযোগ টাওয়ারের বিষয়টিও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, টাওয়ারটি বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল থেকে প্রায় ১৩৫ মিটার দূরে অবস্থিত। ওই এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সময় টাওয়ারটিও লক্ষ্যবস্তু ছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে সেখানে আঘাত হানার কথা জানা যায়।

তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই যোগাযোগ টাওয়ার কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না। এটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মুঠোফোন, টেলিফোন ও ইন্টারনেট যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হতো।

অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলের ভবনের ছাদের ক্ষয়ক্ষতি। তাদের মতে, ছাদের ওপরের ধ্বংসের ধরন দেখে মনে হচ্ছে কোনো বিস্ফোরক সরাসরি ছাদে অথবা ছাদের খুব কাছাকাছি বিস্ফোরিত হয়েছে। কাছের কোনো যোগাযোগ টাওয়ারে হামলার পর সেখান থেকে ধ্বংসাবশেষ ছিটকে এসে ভবনের এমন ক্ষতি হয়েছে—এমন ব্যাখ্যার সঙ্গে দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একজন অস্ত্র বিশ্লেষক ভবনের ছাদের ক্ষতির ধরন পর্যালোচনা করে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। আরেক বিশেষজ্ঞও একই ধরনের ধারণা প্রকাশ করে দাবি করেছেন, ঘটনাস্থলের ক্ষয়ক্ষতির ধরন একটি নির্দিষ্ট ওজনের মার্কিন আকাশপথে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র ব্যবহারের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ঘটনাস্থলে পাওয়া কিছু ধ্বংসাবশেষ নিয়েও অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এগুলোর কয়েকটি মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্রের অংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। তবে এসব ধ্বংসাবশেষ ওই বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলে আঘাত হানা অস্ত্রেরই অংশ কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের ঘটনা সম্পর্কে তদন্ত করা হচ্ছে। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষও ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা জানিয়েছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলেছে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ইরানে চলমান সংঘাতে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগেও দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সামরিক হামলায় সাধারণ মানুষ হতাহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকা বা সাধারণ মানুষের সমাগমস্থলের কাছাকাছি সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি কতটা বাড়ে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বৃহস্পতিবার কুহেস্তাকে বিস্ফোরণে নিহতদের স্মরণে জানাজা ও শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পুরো এলাকায় শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। আকস্মিক বিস্ফোরণের ঘটনায় মানুষ এখনো আতঙ্ক ও হতবাক অবস্থার মধ্যে রয়েছেন।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কুহেস্তাকের এই বিস্ফোরণ নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে কোনো বেসামরিক অনুষ্ঠানে সরাসরি সামরিক অস্ত্র আঘাত হেনেছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হামলার দায়, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং প্রকৃত লক্ষ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনাটিকে ঘিরে ওঠা বিভিন্ন দাবিকে সম্ভাবনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!