রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আল জাজিরার প্রতিবেদন

ভারতের আশ্রয়ে হাসিনাকে কেন ঢাকায় ফেরানো কঠিন

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৮, ২০২৫, ০১:৩৮ পিএম

ভারতের আশ্রয়ে হাসিনাকে কেন ঢাকায় ফেরানো কঠিন

ফাইল ছবি

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডকে ঘিরে দেশজুড়ে আনন্দ-উল্লাস হচ্ছে। তবে, শেখ হাসিনা বিচার কিংবা ফাঁসির মঞ্চ থেকে এখনও অনেক দূরে, ভারতের নিউ দিল্লিতে নির্বাসনে নিরাপদে অবস্থান করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিমা আক্তার ফুটবল অনুশীলনের সময়ই বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারেন, শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। তার বহু বন্ধুই গত বছরের আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। তাই শেখ হাসিনাকে শাস্তির ঘোষণা তার কাছে প্রতিশোধোর মুহূর্ত বলে মনে হয়েছে। তবে, এক ধরনের ন্যায়বিচারের স্বাদ পেলেও এটুকু তার কাছে যথেষ্ট নয়।

তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভেবেছিলেন যে তাকে পরাজিত করা যাবে না, তিনি চিরকাল শাসন করতে পারবেন। তার মৃত্যুদণ্ড আমাদের শহীদদের জন্য ন্যায়বিচারের দিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। আমরা তাকে ঢাকায় ফাঁসিতে দেখতে চাই।’

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ২০২৪ সালের আগস্টে আন্দোলনের চাপে দেশ ছাড়ার পর থেকে হাসিনা ভারতের রাজধানীতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য বারবার আহ্বানও জানিয়েছে, যা গত ১৫ মাসে দুই দেশের সম্পর্কে বড় টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে।

এখন আদালতের রায় ঘোষণার পর সেই চাপ আরও বেড়েছে। কিন্তু ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লি হাসিনাকে ফেরত দেবে—এমনটা প্রায় অসম্ভব। যদিও ভারত হাসিনা পরবর্তী ঢাকার সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী। ভারতের সাবেক ঢাকাস্থ হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘ভারত কীভাবে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে?’

‘অত্যন্ত অ-বন্ধুত্বপূর্ণ কাজ’

বাংলাদেশের দীর্ঘতম ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথমবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। তবে, ২০০১ সালে নির্বাচনে পরাজিত হলে তিনি তার ৫ বছরের শাসন আর দীর্ঘ করতে পারেননি। কিন্তু ২০০৯ সালে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসন গ্রহণের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত টানা ১৫ বছরের বেশি সময় শাসন করে গেছেন তিনি।

এর মধ্যে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে সবগুলোই সমালোচনার মধ্যে পড়েছিল। বিরাধীদলগুলো হাসিনার শাসনামলের সবগুলো নির্বাচনই বয়কট করে। তার শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজও হয়েছিলেন। অনেককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। নির্যাতনের ঘটনা হয়ে ওঠে অতি সাধারণ এবং তার বিরোধীদের বিচার ছাড়াই কারাগারে পাঠানো হয়।

সর্বশেষ তিনি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংস দমন-পীড়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে এ দাবি হাসিনার পদত্যাগের জন্য জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়।

গণবিক্ষোভ ক্রমশই ভয়াবহ রুপ নিলে ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে পালিয়ে যান এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় ছাত্র বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশ ও হাসিনার দলের লোকজনের সংঘর্ষে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হন।

দিল্লির প্রধান যুক্তি, ‘এই বিচার রাজনৈতিক প্রকৃতির’

বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, দু’দেশের মধ্যে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে দিল্লির “বাধ্যবাধকতা” রয়েছে হাসিনাকে ফেরত দেয়ার। ভারত এ দাবি অগ্রাহ্য করলে তা “অমিত্রসুলভ আচরণ” হবে। হাসিনাকে আশ্রয় দেয়া ভারতের জন্য একটি অত্যন্ত অ-বন্ধুত্বপূর্ণ কাজ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবজ্ঞা বলেও মন্তব্য করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কিন্তু ভারতীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রত্যর্পণ চুক্তিতে স্পষ্ট ব্যতিক্রম রয়েছে। আর সেটি হলো—যদি অপরাধটি ‘রাজনৈতিক প্রকৃতির’ হয় তাহলে চুক্তি প্রত্যর্পণে বাধ্যবাধকতা থাকে না। ভারতের দৃষ্টিতে হাসিনার বিচার ও রায় মূলত রাজনৈতিক প্রতিশোধ।

জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদ্বাজ আল জাজিরাকে বলেন, ‘ভারতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশে এখন “অ্যান্টি–ইন্ডিয়া শক্তি” ক্ষমতায় রয়েছে। ইউনূস প্রায়শই ভারতের সমালোচনা করেছেন এবং হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা আন্দোলনের নেতারা প্রায়শই নয়াদিল্লিকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সমর্থনের জন্য দোষারোপ করেছেন।’ ভরদ্বাজ জানান, এই পটভূমিতে, হাসিনাকে হস্তান্তর করার অর্থ হবে ভারতের বিরোধীদের বৈধতা দেয়া।

‘ভারতের সমীকরণের পরিবর্তন প্রয়োজন’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে—তারা হাসিনার বিরুদ্ধে এ রায় খেয়াল করেছে এবং তারা বাংলাদেশে শান্তি, স্থিতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র চায়। নয়াদিল্লি সর্বদা সকল অংশীদারদের সাথে গঠনমূলকভাবে যোগাযোগ করবে বলেও জানায় দেশটি।

কিন্তু বাস্তবে দুই দেশের সম্পর্ক এখন বেশ শীতল। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এখন পরিণত হয়েছে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বেড়াজালে। পিনাক চক্রবর্তী জানান, তিনি আশা করেন না যে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক শিগগিরই পরিবর্তিত হবে। এই সরকারের অধীনে সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকবে কারণ তারা বারবার বলবে যে ভারত হাসিনাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে না। তবে তিনি আশা করেন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর একটি নতুন সূচনা এনে দিতে পারে দুই দেশের সম্পর্কে।

দিল্লির বহু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আওয়ামী লীগ ভারতের সেরা অংশীদার হলেও বাংলাদেশে জনগণের ক্ষোভ দেখে ভবিষ্যতে নতুন শক্তির সঙ্গে কাজ করার প্রস্তুতি নেয়া জরুরি। জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ‘ভারত হাসিনার ওপর আবদ্ধ। নয়াদিল্লি ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। হাসিনা সর্বদা ভারতের জন্য সেরা বাজি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের কখনই অন্য কোনো অংশীদারের সাথে ভালো সমীকরণ ছিল না। কিন্তু এখন তা পরিবর্তন করতে হবে। ভারতকে এখন নতুন সমীকরণে মানিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশে হাসিনাকে আর কখনও সুযোগ দেয়ার সম্ভাবনা কম।’

হাসিনাকে আঁকড়ে ধরে রাখার সুবিধা

দুই দেশ ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত ভাগ করে এবং ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। দেশ দুটির সম্পর্ক মূলত মজবুত ছিল হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে। যদিও ভারত দীর্ঘদিন ধরে জোর দিয়ে বলে আসছে যে তার সম্পর্ক বাংলাদেশের সাথে, ঢাকার কোনো দল বা নেতার সাথে নয়।

হাসিনার রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক পুরোনো। ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডে পরিবারের সদস্য হারানোর পর তিনি ও তার বোন স্বামী সন্তান নিয়ে প্রথম আশ্রয় নেন নয়াদিল্লিতে। পরবর্তীকালে তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরে দুই দফায় ক্ষমতায় আসেন এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেন।

২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও তিনি স্বাভাবিকভাবেই ভারতে আশ্রয় নেন। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান।

পিনাক চক্রবর্তী বলেন, ‘একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছিলেন কারণ তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি কি এখন বাংলাদেশে ফিরতে পারেন—বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের পর? তিনি ভারতের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলেন, আর ভারতকে নৈতিক অবস্থান নিতে হবে।’

রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ: সত্যিই কি হাসিনার অধ্যায় শেষ?

ওয়াশিংটনভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, হাসিনার নির্বাসন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কাঁটা হয়ে থাকলেও ভারত তার মিত্রের প্রতি অনুগত থাকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে। 

তবে তিনি এটাও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় চরিত্রগতভাবে রাজনৈতিক বংশধারা সহজে বিলীন হয় না। আওয়ামী লীগও হয়তো আবার উত্থানের সুযোগ পেতে পারে। তখন ভারতের কৌশলগত যোগাযোগ আজকের সিদ্ধান্ত থেকে ফল পেতে পারে এবং দলটি প্রত্যাবর্তনের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।


 

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!