প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ১১:৪৪ এএম
মিসরের ৭১ বছর বয়সী এক নারী কোরআনের প্রতি নিজের দীর্ঘদিনের ভালোবাসা, অধ্যবসায় ও আত্মনিবেদনের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। হাজিয়া সানা নামের ওই নারী ফজরের নামাজের পর মুখস্থ কোরআন তেলাওয়াত শুরু করে মাগরিবের সময়ের মধ্যে পুরো কোরআন খতম করেছেন। বয়সের ভার কিংবা জীবনের নানা প্রতিকূলতা তার কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ককে দুর্বল করতে পারেনি।
হাজিয়া সানা মিসরের মেনুফিয়া এলাকার মেইত শাহালা গ্রামের বাসিন্দা। ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় জ্ঞান ও পবিত্র কোরআনের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। তরুণ বয়সে নিয়মিত বেতারে কোরআন তেলাওয়াত শুনতেন তিনি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে কোরআন মুখস্থ করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে নিজের চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে কোরআনের আয়াত মুখস্থ করতে শুরু করেন।
জানা যায়, মাত্র ২০ বছর বয়সেই হাজিয়া সানা সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করেছিলেন। তবে কোরআন মুখস্থ করার এই পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে সংসার, সন্তান ও পরিবারের নানা দায়িত্ব সামলাতে হয়েছে। তিন সন্তানের মা হিসেবে পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি কোরআনের সঙ্গে নিজের সম্পর্কও ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।
একপর্যায়ে তিনি কোরআনের একটি বড় অংশ মুখস্থ করতে সক্ষম হন। কিন্তু স্বামীর অসুস্থতার কারণে তার হিফজের ধারাবাহিকতায় বাধা আসে। স্বামী প্রায় ছয় মাস অসুস্থ থাকায় তার সেবাযত্নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন হাজিয়া সানা। এ সময় কোরআন মুখস্থ ও নিয়মিত অনুশীলনের কাজ অনেকটাই থেমে যায়।
স্বামীর মৃত্যুর পরও পরিস্থিতি সহজ হয়নি। শোক, পারিবারিক দায়িত্ব এবং জীবনের নানা পরিবর্তনের কারণে কোরআন মুখস্থ করার আগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। তবে দীর্ঘ বিরতির পরও তিনি হাল ছেড়ে দেননি। সময়ের সঙ্গে আবার কোরআনের কাছে ফিরে আসেন এবং মুখস্থ করা অংশগুলো নিয়মিত পুনরাবৃত্তি শুরু করেন।
মুখস্থ করা আয়াতগুলো যাতে ভুলে না যান, সেজন্য তিনি অন্য নারীদের সঙ্গে নিয়মিত তেলাওয়াত ও পুনরাবৃত্তির আসরে অংশ নিতে শুরু করেন। বর্তমানে ২০ জনের বেশি নারীর সঙ্গে তিনি নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াতের এমন একটি আসরে অংশ নেন। সেখানে তারা প্রত্যেকে নিজেদের মুখস্থ করা অংশ তেলাওয়াত করেন এবং পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। এভাবে সম্মিলিত অনুশীলনের মাধ্যমে তারা মুখস্থ করা আয়াতগুলো ঝালিয়ে নেন।
হাজিয়া সানার এই আসরের সঙ্গীদের মধ্যে বিভিন্ন বয়সী নারী রয়েছেন। তাদের একজন প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ঠ বান্ধবীও রয়েছেন, যিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পড়াশোনা না করেও সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করেছেন। কোরআনের প্রতি তাদের এই সম্মিলিত ভালোবাসা হাজিয়া সানার দীর্ঘ সাধনাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
সম্প্রতি হাজিয়া সানা এমন এক অনন্য অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, যা তার দীর্ঘদিনের কোরআনচর্চার বিশেষ স্বীকৃতি হয়ে উঠেছে। একদিন ফজরের নামাজ আদায়ের পর তিনি মুখস্থ তেলাওয়াত শুরু করেন। এরপর বিরতিহীনভাবে স্বাভাবিক ও ধীরস্থির গতিতে তেলাওয়াত চালিয়ে যান। দিনের শেষভাগে মাগরিবের সময়ের মধ্যে তার সম্পূর্ণ কোরআন তেলাওয়াত শেষ হয়।
৭১ বছর বয়সে এসে এক দিনে সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ তেলাওয়াত করার এই ঘটনা তার দীর্ঘদিনের সাধনা ও নিয়মিত অনুশীলনেরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে নিজের এই অর্জনকে তিনি ব্যক্তিগত মেধা বা সক্ষমতার ফল হিসেবে দেখতে চান না। বরং মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও সাহায্য হিসেবেই বিষয়টিকে দেখেন তিনি।
হাজিয়া সানার জীবনকাহিনি দেখায়, বয়স কিংবা পারিবারিক ব্যস্ততা ইচ্ছাশক্তিকে থামিয়ে দিতে পারে না। জীবনের বিভিন্ন সময়ে বিরতি এলেও কোরআনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। বরং প্রতিকূলতা কাটিয়ে তিনি আবারও তেলাওয়াত ও মুখস্থের চর্চায় ফিরে এসেছেন। তার এই অধ্যবসায় ধর্মীয় অনুশীলনে আগ্রহী অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কোরআনের সঙ্গে থাকা হাজিয়া সানার কাছে এক দিনে সম্পূর্ণ কোরআন তেলাওয়াত তাই কেবল একটি অর্জন নয়; এটি তার জীবনের দীর্ঘ সাধনা, ভালোবাসা, ধৈর্য ও আত্মনিবেদনের একটি স্মরণীয় অধ্যায়।



