প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম
মানুষের জীবন দ্রুত সময়ের স্রোতে এগিয়ে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর ও চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট হয়। কিন্তু শুধু বয়স বাড়লেই মানুষের চিন্তা, বিবেক ও প্রজ্ঞার পরিপক্বতা আসে—এমন নয়। জীবনের একটি পর্যায়ে এসে নিজের কাজ, ভুল ও ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে আত্মসমালোচনা করা এবং সত্যের পথে ফিরে আসাই মানুষের প্রকৃত পরিপক্বতার পরিচয়।
ইসলামী শিক্ষায় জীবনের পরিণত বয়সকে আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সৎকর্মে ফিরে আসার গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ৪০ বছর বয়সে পৌঁছানোর প্রসঙ্গে একজন মুমিনের যে প্রার্থনার কথা বলা হয়েছে, সেখানে আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়, সৎকর্ম করার সামর্থ্য লাভ এবং সন্তানদের সংশোধনের জন্য প্রার্থনা করার শিক্ষা রয়েছে।
সূরা আল-আহকাফের ১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ যখন পূর্ণ শক্তিতে পৌঁছে এবং ৪০ বছরে উপনীত হয়, তখন সে আল্লাহর কাছে তাঁর দেওয়া নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং তাঁর পছন্দনীয় সৎকর্ম করার সামর্থ্য প্রার্থনা করে। একই সঙ্গে নিজের সন্তানদের সংশোধনের জন্যও দোয়া করে এবং তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ফিরে আসার অঙ্গীকার করে।
ইসলামী বর্ণনায় দীর্ঘ জীবন পাওয়াকে শুধু সৌভাগ্য হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এর সঙ্গে দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ যাকে দীর্ঘ জীবন দিয়েছেন এবং তাকে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন, তার জন্য ওজর পেশ করার সুযোগ আর অবশিষ্ট থাকে না। এই হাদিস মানুষের জন্য আত্মশুদ্ধি ও ঈমানের পথে ফিরে আসার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
জীবনের শেষ পর্যায়েও যদি কেউ নিজের ভুল ও অন্যায় থেকে ফিরে না আসে, তবে মৃত্যুর পর তার কাজের প্রভাবও থেকে যেতে পারে। একজন মানুষ জীবদ্দশায় যে কাজ বা চিন্তার প্রচলন করে যায়, পরবর্তী সময়ে অন্যরা তা অনুসরণ করলে তার প্রভাবও তার আমলনামায় যুক্ত হওয়ার বিষয়টি ইসলামী শিক্ষায় গুরুত্ব পেয়েছে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষ কিয়ামতের দিন নিজের করা ভালো ও মন্দ কাজ সামনে উপস্থিত দেখতে পাবে। তখন মানুষ নিজের মন্দ কাজ থেকে অনেক দূরে থাকার আকাঙ্ক্ষা করবে। অর্থাৎ দুনিয়ায় করা কোনো কাজই শেষ পর্যন্ত হিসাবের বাইরে থাকবে না।
সূরা আল-কাহফের ৪৯ নম্বর আয়াতেও মানুষের আমল সংরক্ষিত থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ছোট কিংবা বড় কোনো কাজই বাদ দেওয়া হয়নি; সবকিছু হিসাবের মধ্যে রাখা হয়েছে। মানুষ সেদিন নিজের সব কর্ম সামনে উপস্থিত দেখতে পাবে এবং আল্লাহ কারও প্রতি জুলুম করবেন না।
এ ছাড়া সূরা ইয়াসিনের ১২ নম্বর আয়াতে মানুষের আগে পাঠানো কাজ এবং মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া প্রভাব সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, মানুষের দায়িত্ব শুধু নিজের জীবনের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তার রেখে যাওয়া ভালো বা মন্দ প্রভাবও অন্যদের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই বয়স যতই বাড়ুক, সত্য উপলব্ধি করে নিজেকে সংশোধনের সুযোগকে অবহেলা না করার শিক্ষা রয়েছে ইসলামে। খ্যাতি, সম্পদ কিংবা পার্থিব সাফল্যের পেছনে ছুটে জীবনের আসল উদ্দেশ্য ভুলে না গিয়ে আত্মশুদ্ধি, তাওবা, সৎকর্ম ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করাই হতে পারে জীবনের প্রকৃত সাফল্যের পথ।
জীবনের সময় সীমিত। তাই বার্ধক্য এসে যাওয়ার অপেক্ষা না করে নিজের ভুল বুঝতে পারা, অন্যায় থেকে ফিরে আসা এবং সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির পথে চলার চেষ্টা করাই একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আত্মিক প্রস্তুতি।



