প্রকাশিত: মার্চ ২১, ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
লাখো মুসল্লির অংশগ্রহণ ও কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহ ময়দানে ঈদুল ফিতরের জামাত। এটি শোলাকিয়ায় ১৯৯তম ঈদ জামাত। শনিবার (২১ মার্চ) সকাল ১০টায় শুরু হওয়া জামাতে ইমামতি করেন মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ।
নামাজ শেষে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ, মুসলিম উম্মাহর শান্তি এবং দেশের সমৃদ্ধি কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
ঈদগাহে মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকাল ৭টার আগেই কিশোরগঞ্জ শহরসহ শোলাকিয়া এলাকা কঠোর নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে ফেলা হয়। চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশের আগে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করা হয়। ছাতা, লাঠিসোঁটা, দিয়াশলাই বা লাইটার নিয়ে মাঠে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
নামাজ শুরুর আগে বন্দুকের গুলির মাধ্যমে সংকেত দেওয়া হয়। ১৫ মিনিট আগে তিনটি, ১০ মিনিট আগে দুটি এবং পাঁচ মিনিট আগে একটি গুলি ছোড়া হয়। এই কার্যক্রম পরিচালনা করে জেলা পুলিশ।
ভোর থেকেই নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ঈদগাহ মাঠে মুসল্লিদের ঢল নামে। কয়েক ঘণ্টার জন্য শহরের সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। জামাত শুরুর প্রায় এক ঘণ্টা আগে সাত একর আয়তনের মাঠ কানায় কানায় ভরে যায়। অনেক মুসল্লি মাঠে জায়গা না পেয়ে পাশের সড়ক, ফাঁকা জায়গা, নদীর পাড় এবং আশপাশের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন।
নারীদের জন্য পৃথক ঈদ জামাতের ব্যবস্থা করা হয় শহরের সরযূবালা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে, যেখানে বহু নারী অংশগ্রহণ করেন।
নামাজ শুরুর আগে মুসল্লিদের স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক ও ঈদগাহ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল।
২০১৬ সালে শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। এবারও চার প্লাটুন সেনাবাহিনী, পাঁচ প্লাটুন বিজিবি, প্রায় ১১০০ পুলিশ, শতাধিক র্যা ব সদস্য, এপিবিএন ও আনসার সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করেছেন। ড্রোন ক্যামেরা ও সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার বসানো হয়েছে। অ্যান্টি-টেররিজম ও বোমা ডিসপোজাল ইউনিটও মোতায়েন ছিল।
মাঠ ও শহরের অলিগলিতে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়। দায়িত্ব পালন করেন ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। মেডিক্যাল টিম, তিনটি অ্যাম্বুলেন্স এবং অগ্নিনির্বাপণ দলও প্রস্তুত ছিল। বিপুল সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক স্কাউটের মাধ্যমে সহায়তা করা হয়।
ঈদের জামাতে কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেনসহ জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
শোলাকিয়া ঈদগাহের নিয়মিত অংশগ্রহণকারী ময়মনসিংহের নান্দাইলের আরিফুল ইসলাম (৭০) বলেন, “যতদিন বেঁচে আছি ততদিন শোলাকিয়ার জামাতে নামাজ আদায় করব।” কুলিয়ারচর থেকে নাতিকে নিয়ে আসা রফিকুল ইসলাম (৬০) বলেন, “এখানে নামাজ আদায় করলে শান্তি পাওয়া যায়। তাই বারবার আসি।”
শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানিয়েছেন, এবার দুই লক্ষাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করেছেন। ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মুসল্লিরা এখানে সমবেত হয়েছেন।
ঈদের দিন মুসল্লিদের যাতায়াতের জন্য দুটি বিশেষ ট্রেন চালু করা হয়। একটি ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে সকাল ৮টায় কিশোরগঞ্জে পৌঁছে, অন্যটি ময়মনসিংহ থেকে পৌনে ৬টায় ছেড়ে সকাল সাড়ে ৮টায় পৌঁছে। নামাজ শেষে যাত্রীদের নিয়ে ট্রেন দুটি ফিরে যায়।
শোলাকিয়া ঈদগাহের ঐতিহ্য বহুপ্রাচীন। মোগল আমলে এখানে পরগনার রাজস্ব শোলাকিয়ায় আদায় করা হতো। ১৮২৮ সালে একসঙ্গে সোয়া লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করেন।



