প্রকাশিত: মার্চ ২৯, ২০২৬, ০১:৪২ পিএম
২০১৩ সালের ভয়ঙ্কর রানা প্লাজা দুর্ঘটনার সেই দিনটি বাংলাদেশে শিল্প-দুর্ঘটনার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। চারতলা ইট ও সিমেন্টের ভেঙে পড়া ভবন থেকে সেদিন জীবিত বেরিয়ে আসেন নাসিমা। তখন তার শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মানসিক শক্তি ও জীবনের প্রতি আশার প্রদর্শন ছিল বিস্ময়কর। তবে রাজধানী ও দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ছায়া এবার নাসিমার জীবনের সর্বশেষ দিনগুলোকে গ্রাস করে নিল পুরোপুরিভাবে।
ভাগ্য নাসিমার প্রতি বরাবরই কঠোর ছিল।রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি থেকে দিনাজপুরে যে কয়েকজন নারী বেঁচে ফিরেছিলেন, তার মধ্যে তিনটি আলোচিত নাম হলো ঘোড়াঘাটের রেশমা বেগম, পার্বতীপুরের নাসিমা বেগম এবং ফুলবাড়ীর রেবেকা সুলতানা। ২৬ এপ্রিল রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ঘটনার তিন দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার হয়েছিলেন তারা। রানা প্লাজার সেই দুঃসহ স্মৃতি কাটিয়ে উঠে সে জীবনকে নতুনভাবে শুরু করার চেষ্টা করেছিলেন নাসিমা বেগম। কিন্তু নিরাপদ জীবন ধারণের সুযোগ আর পেলেন না তিনি।
ঈদ শেষে গত ২৫ মার্চ বুধবার বিকেলে নাসিমা, তার অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি আজমিরা খাতুন, ভাগনির স্বামী আব্দুল আজিজ আজাদ ও চার বছরের শিশু আব্দুর রহমান বাসযোগে ঢাকার ফিরছিলেন। বিকেল ৫টার দিকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাট এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আব্দুল আজিজ জীবিত উদ্ধার হলেও প্রায় ছয় ঘণ্টা পর, রাত সাড়ে ১১টার দিকে নদী থেকে উদ্ধার করা হয় নাসিমা বেগম, তার অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি আজমিরা খাতুন এবং ছোট্ট শিশু আব্দুর রহমানকে।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা নাসিমার জন্য শেষ ছিল না। তার জীবনে এখনো অপেক্ষা করছিল জীবনের শেষ দুর্ঘটনা। অ্যাম্বুল্যান্সে করে লাশ নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলে কুষ্টিয়া এলাকায় লাশবাহী গাড়িটি আবারও দুর্ঘটনার শিকার হয় বলে জানান নাসিমার চাচাতো ভাই জুলফিকার আলী ভুট্টু।
পরিবারের সদস্য ও চিকিৎসকরা জানান, এম্বুলেন্সে নাসিমার মরদেহ থাকাকালীন ফের দুর্ঘটনা ঘটে। এতে শেষ বিদায় দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) জুমার নামাজের পর দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের মথুয়ারাই গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি তিনটি কবরে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়। একই পরিবারের তিনজনের এই মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। নিহত নাসিমা বেগম (৪০) ওই গ্রামের মৃত নূর ইসলামের স্ত্রী।
নাসিমার পরিবার ও স্থানীয়রা বলছেন, তার জীবন সবসময়ই বিপদের সঙ্গে লড়াইয়ে ব্যয় হয়েছে। একের পর এক দুর্ঘটনার ছায়া তার ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। রানা প্লাজা থেকে বেঁচে উঠে কিছুদিন শান্তির চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু জীবন তাকে আর ছাড়েনি। মৃত্যুর পরও তার জন্য শান্তি ও সমাধি আসেনি।
শেষবারের মতো জীবন-সংগ্রামের চিত্র
নাসিমার জীবন ছিল অদম্য সাহসের গল্প। রানা প্লাজা থেকে বেঁচে ওঠা মানসিক ও শারীরিক শক্তি তাকে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে সাহায্য করেছিল। রানা প্লাজার ট্রাজেডির পরে গ্রামের বাড়ি চলে যান নাসিমা। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আবারও জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকার সাভারে ভাগনি আজমিরা খাতুনের বাসায় যান। প্রায় এক মাস চেষ্টা করেও কোনো কাজ জোটাতে পারেননি। পরে ঈদ উপলক্ষে তারা ফরিদপুরে আজমিরার শ্বশুরবাড়িতে যান। সেখান থেকেই ঈদ শেষে একসঙ্গে ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন- যা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে তাদের জীবনের শেষ যাত্রা। এটাই ছিল তার জীবনের শেষ কর্মের সন্ধান। আর কোনোদিন তাকে কর্মের সন্ধান করতে হবে না। সড়ক দুর্ঘটনা তার নতুন জীবনকেও ছিনিয়ে নিল। শান্তি পেল না মৃত্যুর পরেও।



