প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম
ধর্ষণ মামলায় কারাভোগের পর ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া ফেনীর আলোচিত ইমাম মাওলানা মুজাফফর আহমদ জুবায়েরের জীবন এখন এক চরম মানবিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। মুক্তি পেলেও সামাজিক লাঞ্ছনা, দীর্ঘ আইনি লড়াই ও মানসিক আঘাতে তিনি ভারসাম্য হারিয়ে বর্তমানে রাজধানীর একটি মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মামলায় কারাবন্দি থাকা অবস্থায় তিনি একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন এবং দেয়ালে মাথা ঠুকে গুরুতরভাবে আহত হন। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও সেই মানসিক ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি।
গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজার ছোট ভাই ইমনের বাসায় অবস্থানকালে হঠাৎ তিনি আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করেন। এ সময় তিনি বাসার আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটের মালিককেও আঘাত করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশকে খবর দেওয়া হয় এবং তাকে উদ্ধার করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রাথমিক চিকিৎসা ও ইনজেকশন দেওয়ার পর তিনি বর্তমানে স্থিতিশীল আছেন। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না থাকা এবং আইনি অভিভাবকের অনুপস্থিতির কারণে তাকে পূর্ণাঙ্গভাবে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। পরে পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় পৌঁছালে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আদাবরের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার চিকিৎসায় পাশে দাঁড়িয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাইদুল আশরাফ কুশল, যিনি আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ও ধর্ম ও সম্প্রীতি সেলের সমন্বয়ক তারেক রেজা বলেন, একজন নির্দোষ আলেমকে মিথ্যা অপবাদে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সেই গভীর মানসিক আঘাত থেকেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে তার চিকিৎসা চলছে বলে তিনি জানান।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০১৯ সালে ফেনীর পরশুরামে একটি মক্তবপড়ুয়া কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। পরে ২০২৪ সালের নভেম্বরে স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মাওলানা জুবায়েরের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ৩২ দিন কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পেলেও সমাজে গ্রহণযোগ্যতা হারান। পরে তদন্তে ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণ মেলে, ওই কিশোরীর সন্তানের জৈবিক পিতা তার নিজের ভাই। ২০২৫ সালের ১৯ মে অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। তবে ততদিনে জুবায়েরের জীবন ও পরিবার ভেঙে পড়ে।
অসুস্থ হওয়ার কয়েক দিন আগে গত ৯ মে ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটে এক সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, কোনো নোটিশ ছাড়াই তাকে মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। মামলার খরচ চালাতে পৈতৃক জমি বিক্রি করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি তিনটি দাবি তুলে ধরেন—চাকরিতে পুনর্বহাল ও বকেয়া বেতন প্রদান, মিথ্যা মামলায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ। পরে তার দাবির প্রতি সংহতি জানান স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা।
ফেনী জেলা আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম সৈকত বলেন, তিনি অসুস্থ হওয়ার খবর পেয়ে ঢাকায় এসে হাসপাতালে অবস্থান করছেন এবং তার দ্রুত সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।



